তোফায়েল গাজালি
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষের কথাবার্তায় দ্বীনি বিষয়ে চরম অবজ্ঞা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি একটি বিতর্কিত বিষয় সামনে এসেছে, ‘জাকাত ও ফিতরার চেয়ে চাঁদাবাজি বেটার (উত্তম)’।
একজন মুসলমানের মুখ থেকে এ ধরনের কথা উচ্চারণ দুঃখজনকই নয়, বরং তার ঈমানি অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি। ইসলামি শরিয়তের আলোকে এর বিধান অত্যন্ত কঠোর।
ইসলামে জাকাত ও ফিতরার মর্যাদা
জাকাত ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি। পবিত্র কুরআনে বারবার নামাজের পাশাপাশি জাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন: ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ (সূরা বাকারা: ৪৩)
অন্যদিকে সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা হলো একটি ওয়াজিব ইবাদত, যা রমজানের ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিমার্জন করে এবং দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটায়।
চাঁদাবাজি কবিরা গুনাহ
ইসলামে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা চাঁদাবাজি করা ‘গসব’ ও ‘জুলুম’-এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন: ‘জেনে রাখ! তোমাদের জান, তোমাদের মাল, তোমাদের সন্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের এ মাস, তোমাদের এ শহর, আজকের এ দিন সন্মানিত।’ (সহিহ বুখারি: ৬৭)
রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৫৩)। সুতরাং চাঁদাবাজি একটি জঘন্য কবিরা গুনাহ।
ফরজের ওপর হারামকে প্রাধান্য দেওয়ার বিধান
ইসলামি আকাইদ ও ফিকহ শাস্ত্রের সর্বসম্মত নীতি হলো-ইসলামের কোনো অকাট্য ফরজ বিধানকে তুচ্ছজ্ঞান করা অথবা হারামের সঙ্গে তুলনা করে হারামকে শ্রেষ্ঠ বলা ‘কুফরি’।
১. আল-ফিকহুল আকবর-এ ইমাম আবু হানিফা (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ইসলামের অকাট্য বিধান নিয়ে উপহাস করা বা একে ছোট করা ঈমান ভঙ্গের কারণ।
২. ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে, যদি কেউ শরিয়তের কোনো বিধানকে তুচ্ছ মনে করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। (খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭৩)।
৩. ফতোয়ায়ে শামি (রদ্দুল মুহতার) অনুযায়ী, হারামের শ্রেষ্ঠত্ব ফরজের ওপর দেওয়া সরাসরি ধর্মত্যাগের নামান্তর।
চাঁদাবাজি উত্তম বললে ঈমান থাকবে না
যদি কোনো ব্যক্তি সচেতনভাবে এবং বিশ্বাস রেখে বলে যে ‘জাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি ভালো’ তবে শরিয়তের ফয়সালা অনুযায়ী: ওই ব্যক্তি ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবে এবং তার আগের সব নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে।
তওবা ও প্রতিকার
কেউ যদি না বুঝে বা রাগের মাথায় এমন কথা বলে ফেলে, তবে তাকে দ্রুত ঈমান নবায়ন করতে হবে এবং লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।
জাকাত হলো আল্লাহর হক এবং গরিবের অধিকার, যা সমাজ থেকে অভাব দূর করে। আর চাঁদাবাজি হলো মানুষের ওপর জুলুম, যা সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।
পবিত্র ইবাদতকে এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে তুলনা করা বা একে ছোট করা কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে কলুষমুক্ত রাখতে এবং নিজের পরকাল বাঁচাতে মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দে আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি।