সুবর্ণভূমি ডেস্ক
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বময়তা ও সার্বজনীন সত্ত্বায় মুগ্ধ এক গুণগ্রাহী সমাজমাধ্যমে সম্প্রতি এক আবেগউচ্ছ্বসিত স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু উপস্থাপন করা হলো:
রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্ব বিখ্যাত কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির প্রথম সত্যিকারের বিশ্বপরিব্রাজক।
আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগে, যখন সমুদ্রযাত্রা মানেই ছিল মাসের পর মাস কয়লাচালিত জাহাজে অনিশ্চিত ভ্রমণ, তখন তিনি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা—অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই পড়েছিল তাঁর পদচিহ্ন। সে সময় তিনি যে ৫০-৬০টি দেশ সফর করেছিলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে তা ১০০-এরও বেশি স্বাধীন রাষ্ট্র!
তিনিই বোধহয় প্রথম বাঙালি যিনি মেক্সিকো সফর করেছিলেন। মেক্সিকো সরকার তাঁর শিক্ষাচিন্তায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে শান্তিনিকেতনের জন্য অনুদানও দিয়েছিল। সেই যুগে এক বাঙালি কবির জন্য লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সম্মান—ভাবলেই বিস্ময় জাগে।
১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কয়েক মাস সেখানেই ছিলেন। লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে নদীর ধারে, নিঃসঙ্গ দক্ষিণ আমেরিকান বিকেলে তিনি লিখেছেন বহু কবিতা ও ডায়েরি। সেই সম্পর্ক আজও সাহিত্য-ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায় তাঁর পারস্য ও ইরাক সফর। ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভির বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি ইরান যান। তেহরান, শিরাজ, ইসফাহান—বিভিন্ন শহরে সাহিত্য, সভ্যতা ও মানবতাবাদ নিয়ে বক্তৃতা দেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিখ্যাত কবি হাফিজ ও শেখ সাদি (র.) এর সমাধিতে।
কিন্তু ফেরার সময় তাঁর মনে হয়েছিল—মানবসভ্যতার প্রাচীন উৎসভূমি মেসোপটেমিয়ার মাটিতে পদচিহ্ন না রেখে তিনি কীভাবে ফিরে যাবেন!তখন তিনি বৃদ্ধ। তবু দীর্ঘ ক্লান্তিকর মরুপথ পাড়ি দিয়ে তিনি ইরাকে গেলেন। মরুভূমির বেদুইন তাবুতে থেকেছেন, তাদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন, আরব সভ্যতার আত্মাকে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। একজন কবির মধ্যে কতটা অদম্য কৌতূহল থাকলে তিনি এভাবে পৃথিবীকে জানতে চান!
তিনি শুধু দেশ দেখেননি—সভ্যতাকে পড়েছেন।
জাপানে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। আমেরিকায় গিয়ে অন্ধ জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছেন। সোভিয়েত রাশিয়ায় গিয়ে শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভ্রমণ ছিল পৃথিবীর সঙ্গে এক অন্তহীন সংলাপ।
রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণভিত্তিক লেখাগুলোর মধ্যেও আছে অসাধারণ বৈচিত্র্য। ‘ইউরোপ-যাত্রীর পত্র’, ‘জাপানযাত্রী’, ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’, ‘পারস্যে’, ‘রাশিয়ার চিঠি’—এসব শুধু ভ্রমণকাহিনি নয়; সভ্যতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের উপর এক গভীর পর্যবেক্ষণ।
ভাবতে অবাক লাগে—ঔপনিবেশিক ভারতের এক বাঙালি কবি, শত বছর আগে পৃথিবীর এত প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন; অথচ তখন আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ নিজ জেলা ছাড়িয়েও খুব কম বের হয়েছে।
তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার কাছে শুধু সাহিত্যের নন, ভ্রমণেরও এক মহৎ আইকন। আমার নিজের দেখা এখনও খুব সামান্য। তবু মনে হয়, পৃথিবীকে সত্যিকারের ভালোবাসতে পারলে, পথ একদিন নিজেই দরজা খুলে দেবে। পথের ডাকের অপেক্ষায় স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি।