সুবর্ণভূমি ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে নতুন সরকার গঠনে ভোট দেবে বাংলাদেশের জনগণ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমন্বিত ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের ব্যাপক ঢলে ভোটারদের স্বাধীন মতামত গঠনের প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। আর এই ভুয়া তথ্যের বড় একটি অংশই ছড়াচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে ব্যারন’স।
প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান দেশ বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। ওই আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অপতথ্য মোকাবিলায় একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন, নির্বাচনের আগে ভুল তথ্যের বন্যা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, এসব তথ্য দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই আসছে।
ভুয়া প্রচারের বড় একটি অংশ সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ অমুসলিম, যাদের বড় অংশ হিন্দু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দু গণহত্যা হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে দাবি ছড়ানো হচ্ছে যে হিন্দুরা বাংলাদেশে হামলার শিকার হচ্ছে।
তবে পুলিশের জানুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের জড়িত ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রসূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক্সে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ‘হিন্দু গণহত্যা’দাবি করে সাত লাখেরও বেশি পোস্ট করা হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান রাকিব নাঈক বলেন, আমরা সমন্বিত ভারতীয় ভুয়া তথ্য প্রচার শনাক্ত করেছি। এর ৯০ শতাংশের বেশি কনটেন্ট ভারত থেকে এসেছে।
এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিম যাচাই করা বহু ভুয়া কনটেন্টের মধ্যে রয়েছে একটি এআই-তৈরি ভিডিও, যেখানে এক হাত হারানো এক নারীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র বিপক্ষে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। আরেকটি কম্পিউটার-নির্মিত ভিডিওতে এক হিন্দু নারী দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামিকে ভোট না দিলে হিন্দুদের ভারত পাঠিয়ে দেয়া হবে।
এএফপি জানায়, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া শত শত এআই-তৈরি ভিডিওর খুব কম সংখ্যকেই এআই কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও মতপ্রকাশের সংকোচনের পর এই ভুয়া তথ্যের ঢল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইট-এর প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ভুয়া তথ্য অনেক বেশি। বিনামূল্যের এআই টুল ব্যবহারে জাল কনটেন্ট তৈরি সহজ হয়ে গেছে।
এদিকে ভারতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে। ভারতীয় আইপিএল লিগে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে নিয়ে বিতর্কের জেরে তার ক্লাব চুক্তি বাতিল করে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দলের চলতি মাসের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের মাটি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে গড়ায়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুয়া তথ্যের বড় অংশ ভারত থেকে এলেও এগুলো সরাসরি ভারত সরকার পরিচালিত এমন প্রমাণ নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ‘উদ্বেগজনক ধারা’লক্ষ্য করছে, তবে একই সঙ্গে ‘মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের’পক্ষে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, মেটাসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি মনিটরিং ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন তুুলি সতর্ক করে বলেন, এআই-তৈরি ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট বাংলাদেশের জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরে ৮০ শতাংশের বেশি এবং গ্রামে প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন থাকলেও প্রযুক্তি যাচাইয়ের বিষয়ে সচেতনতা এখনও কম। তিনি বলেন, এআই-তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি।
সূত্র : মানবজমিন