সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৬) ঘিরে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই জমে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায় ভোটারদের মধ্যে যেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তেমনি প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে গ্রাম-গঞ্জ ও শহর। জেলায় চারটি আসনে মোট ১৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচন মূলত বিএনপি ও ১১-দলীয় জোটের (জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক দল সমর্থিত) প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রতিটি আসনেই উন্নয়ন, সুশাসন, কর্মসংস্থান, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া): এই আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ।
প্রধান ইস্যু: সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা গড়া, পাটকেলঘাটাকে উপজেলা ও তালাকে পৌরসভায় রূপান্তর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা।
হাবিবুল ইসলাম হাবিব (বিএনপি–ধানের শীষ): কলারোয়ায় আধুনিক স্টেডিয়াম ও বাইপাস সড়ক নির্মাণ। তালাকে পৌরসভা ও পাটকেলঘাটাকে উপজেলা ঘোষণা। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড, দরিদ্রদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ (জামায়াতে ইসলামী–দাঁড়িপাল্লা): চাঁদাবাজমুক্ত ও নিরাপদ তালা-কলারোয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত।
অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম (বাংলাদেশ কংগ্রেস–ডাব): সততা ও স্বচ্ছতার রাজনীতি। সংসদ ও রাজপথে জনগণের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা। দলীয় আদর্শ অক্ষুণ্ন রেখে জনগণের প্রতিনিধিত্ব।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা): এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির মো. আব্দুর রউফ, জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু, জাসদের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি রবিউল ইসলাম।
প্রধান ইস্যু: পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু, ভোমরা স্থলবন্দর আধুনিকায়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন।
মো. আব্দুর রউফ (বিএনপি): সাতক্ষীরায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু। শতভাগ পাকা সড়ক ও জলাবদ্ধতা নিরসন।
মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক (জামায়াতে ইসলামী): দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত মানবিক রাষ্ট্র। ভোমরা স্থলবন্দর আধুনিকায়ন ও শ্রমিক অধিকার। স্থানীয় অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন।
অধ্যাপক ইদ্রিস আলী (জাসদ): স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ শাসন ব্যবস্থা। দুর্নীতিবাজদের বয়কট ও নাগরিক অধিকার আদায়।
আশরাফুজ্জামান আশু (জাতীয় পার্টি): প্রতিটি ঘরকে ‘এমপির ঘর’ হিসেবে দেখার অঙ্গীকার। প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি। পিছিয়ে পড়া এলাকায় উন্নয়ন।
মুফতি রবিউল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন): ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ): এই আসনে লড়ছেন বিএনপির কাজী আলাউদ্দীন, জামায়াতের মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম।
প্রধান ইস্যু: টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা প্রতিরোধ, আশাশুনি পৌরসভা, মৎস্য খাত উন্নয়ন।
ডা. শহিদুল আলম (স্বতন্ত্র –ফুটবল): মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও তরুণ কর্মসংস্থান।
মুহাদ্দিস রবিউল বাশার (জামায়াতে ইসলামী): আশাশুনি পৌরসভা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১০০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। রেললাইন সংযোগ ও ভোমরা বন্দর উন্নয়ন।
কাজী আলাউদ্দীন (বিএনপি): ৫৪ বছরের উন্নয়ন বঞ্চনা দূরীকরণ।বৈষম্যহীন আধুনিক জনপদ গঠন।
এড. আলিফ হোসেন (জাতীয় পার্টি): টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়ন। নিরাপদ পানি ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) : এই উপকূলীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ড. মো. মনিরুজ্জামান ও জামায়াতের সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম।
প্রধান ইস্যু: সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, সুপেয় পানি, দীর্ঘমেয়াদি বেড়িবাঁধ।
ড. মো. মনিরুজ্জামান (বিএনপি): সুন্দরবন আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। মিনি এয়ারপোর্ট ও সামুদ্রিক বন্দর।
গাজী নজরুল ইসলাম (জামায়াতে ইসলামী): চাঁদাবাজ ও দখলবাজমুক্ত সমাজ। স্বচ্ছভাবে উন্নয়ন বরাদ্দ। কর্মসংস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার চারটি আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৯ জন, নারী ৯ লাখ ১৪ হাজার ৮২৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন। তরুণ ভোটার (১৮–৩৫ বছর) ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬০৯ জন। জেলায় ৬০৯টি ভোটকেন্দ্রে ৩ হাজার ৩৭২টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যালট ও ভোটকেন্দ্র সুরক্ষিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মিজ আফরোজা আখতার। প্রার্থীরা এখন শেষ মুহূর্তের গণসংযোগে ব্যস্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। ভোটারদের প্রত্যাশা, যে প্রার্থী দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, বেড়িবাঁধ ও কর্মসংস্থান সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবেন, তাকেই তারা বেছে নেবেন।