যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের উল্লাস থেকে রক্তাক্ত স্টেডিয়াম

তসলিম শিমুল

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ২০ জুন,২০২৬, ১১:০০ এ এম
ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের উল্লাস থেকে রক্তাক্ত স্টেডিয়াম

ফুটবল মানেই আনন্দ, আবেগ আর বিজয়ের উচ্ছ্বাস। বিশ্বের অসংখ্য স্টেডিয়াম যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে আছে অবিস্মরণীয় ম্যাচ ও কিংবদন্তি ফুটবলারদের কীর্তির জন্য। কিন্তু কিছু স্টেডিয়াম রয়েছে, যাদের ইতিহাসে ফুটবলের গৌরবের পাশাপাশি লুকিয়ে আছে গভীর বেদনা ও মানবতার নির্মম পরাজয়ের গল্প। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর এস্তাদিও নাসিওনাল এমনই একটি স্টেডিয়াম।

১৯৬২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই মাঠে। সেদিন গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ৬৮ হাজারেরও বেশি দর্শক। চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয়। ইনজুরির কারণে ফাইনালে খেলতে না পারলেও কিংবদন্তি পেলের দল গ্যারিঞ্চার অসাধারণ নৈপুণ্যে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে উঠে আসে। সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হয়ে আছে।

কিন্তু মাত্র ১১ বছর পর, ১৯৭৩ সালে, একই স্টেডিয়াম ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়ে ওঠে।

সেই সময় চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদোর আলেন্দে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এরপর শুরু হয় কঠোর সামরিক শাসন। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের অনেককে বন্দী করে রাখা হয় এস্তাদিও নাসিওনাল স্টেডিয়ামে।

যে মাঠে একসময় ফুটবলপ্রেমীরা প্রিয় দলের জন্য উল্লাস করেছিলেন, সেই মাঠই পরিণত হয় অস্থায়ী বন্দীশিবিরে। সেখানে আটক ব্যক্তিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি তথ্যে বলা হয়, স্টেডিয়ামে অন্তত ৪১ জন নিহত হন এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সেখানে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

সামরিক অভ্যুত্থানের মাত্র কয়েক মাস পরই এই স্টেডিয়ামে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের একটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতিবাদে সোভিয়েত দল চিলিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে মাঠে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে গোল করে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে চিলি। ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সময় বদলেছে। আজ এস্তাদিও নাসিওনাল আবারও চিলির জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান ভেন্যু। নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এখানে। তবে স্টেডিয়ামের একটি গেট ও একটি স্ট্যান্ড উৎসর্গ করা হয়েছে সেই সব মানুষদের স্মৃতির উদ্দেশে, যারা ১৯৭৩ সালের সামরিক শাসনের সময় এখানে বন্দী ছিলেন বা প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এস্তাদিও নাসিওনালের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি স্টেডিয়াম শুধু খেলাধুলার মঞ্চই নয়; কখনও কখনও তা একটি জাতির সুখ-দুঃখ, গৌরব ও বেদনার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে। ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের আনন্দ যেমন এই মাঠকে অমর করেছে, তেমনি পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোও ইতিহাসের পাতায় গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে।

ফুটবল মানুষের মধ্যে ঐক্য, ভালোবাসা ও আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। আর চিলির এই স্টেডিয়ামের ইতিহাস আমাদের শেখায়, খেলার উল্লাস যতই মহান হোক না কেন, মানবতা, স্বাধীনতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার সব কিছুর ঊর্ধ্বে। ইতিহাসের এই অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)