সুবর্ণভূমি ডেস্ক
যোগ করা সময়ের ১৩তম মিনিটে বল পর্তুগালের জালে জড়ান ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার ইয়োস্কা গাভার্দিওল। নাটকীয় ম্যাচে ২-২ গোলে সমতায় ফেরার আনন্দে ভেসে যায় ক্রোয়েশিয়া দল ও তাদের সমর্থক। কিন্তু নাটকের তখনো বাকি।
কয়েক মুহূর্ত পরই হস্তক্ষেপ করে ভিএআর। রেফারি ছুটে গিয়ে মাঠের পাশে রাখা মনিটরে ঘটনার ভিডিও রিপ্লে দেখেন বেশ সময় নিয়ে। তখন ভিএআর পর্যালোচনায় অফসাইড হন ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডার মারিও পাসালিচ। গোলটি তাই বাতিল করেন।
ভেঙে যায় ক্রোয়াটদের স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ দলের রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া।
প্রশ্ন উঠেছে, ক্রোয়েশিয়ার গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল?
সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকের সাংবাদিক জ্যাক ল্যাং সিদ্ধান্তটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সেই ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘গাভার্দিওল জটলার ভেতর থেকে বল জালে জড়ানোর পর ক্রোয়েশিয়া মনে করেছিল, তারা সমতায় ফিরেছে।
গোলটি বহালও রাখা হয়েছিল, কিন্তু রিপ্লেতে দেখা যায় গাভার্দিওলকে যিনি পাস দিয়েছিলেন, সেই মারিও পাসালিচ অফসাইডে ছিলেন।’
এরপর বলা হয়, ‘ক্রোয়েশিয়ার দাবি ছিল, গোলটি বৈধ। তাদের মতে, পাসালিচ বল পাওয়ার আগে বক্সের ভেতর ভেসে আসা বলে মাথা ছোঁয়াতে লাফিয়ে ওঠা ইগোর মাতানোভিচ আসলে বল স্পর্শই করেননি।
আর বাঁ প্রান্ত থেকে যখন মূল ক্রসটি করা হয়েছিল, তখন পাসালিচ অফসাইডে ছিলেন না (অনসাইড ছিলেন)।’
সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘এখানে চলে আসে আধুনিক প্রযুক্তির খেলা। ভিএআর এখানে এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা ক্রিকেটের “স্নিকোমিটার”–এর মতো কাজ করে। অর্থাৎ কোনো খেলোয়াড়ের শরীরে বলের অতি সামান্যতম স্পর্শ লেগেছে কি না, তা এই প্রযুক্তি নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে।
বলটি যখন মাতানোভিচের মাথার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন গ্রাফের কাঁটায় একটি সূক্ষ্ম ‘স্পাইক’ বা কম্পন দেখা যায়। এর সহজ অর্থ, মাতানোভিচের মাথা বল ছুঁয়েছিল। আর সে কারণেই পাসালিচ অফসাইড হয়ে যান।’
তাহলে কি বল ক্রোয়েশিয়া ফরোয়ার্ড ইগর মাতানোভিচের মাথার চুল ছোঁয়ার কারণেই পাসালিচ অফসাইড হয়েছেন?
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবোয় রেফারিং বিশ্লেষক ও সাবেক রেফারি পাওলো সিজার অলিভিয়েরার ব্যাখ্যা শুনলে এটাই মনে হয়। তার মতে, পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে মাঠে নরওয়ের রেফারি এসপেন এসকাস সঠিক সিদ্ধান্তই নেন।
সিজার অলিভিয়েরার ব্যাখ্যা, ‘ক্রসটি করার মুহূর্তে পাসালিচ সঠিক পজিশনেই ছিলেন। খালি চোখে মাতানোভিচের সেই আলতো ছোঁয়া ধরা পড়া অসম্ভব ছিল। তবে ফুটবলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা ঠিক এ ধরনের সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলো ধরার জন্যই তৈরি। গ্রাফিকসের মাধ্যমে বলে স্পর্শটি নিখুঁতভাবে দেখতে পান ভিএআর রেফারিরা।
মাতানোভিচের মাথায় লেগে বলটির দিক সামান্য পরিবর্তন হয়েছিল, যা পাসালিচকে অফসাইডের ফাঁদে ফেলেছে। তাই পাসালিচ অফসাইড ছিলেন এবং গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল।’
মাতানোভিচের কথা শুনলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। গোল হওয়ার আগে তিনি বল স্পর্শ করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় চুলে বলের খুব হালকা স্পর্শ লেগেছে। রেফারিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম; কারণ, বল স্পর্শ করার ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না। রেফারি আমাকে জানালেন যে বলের ভেতর চিপ বসানো আছে এবং তাতে হালকা স্পর্শ ধরা পড়েছে।’
ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ অবশ্য এই ম্যাচে রেফারিংয়ের সমালোচনা করেন। ভিএআর নিয়ে আলাদা করে দালিচ বলেন, এই প্রযুক্তি ‘ফুটবলের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে।’
তার ভাষায়, ‘বলছি না যে ভিএআর কখনো সাহায্য করে না, কিন্তু এটি আবেগ ধূলিসাৎ করে দেয়। মাঠে সেই মুহূর্তের অনুভূতিগুলোকে শেষ করে দেয় এবং এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সত্যিই ভীষণ কঠিন।’
পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেন, ‘বার্তা একেবারে পরিষ্কার, এখন বলের ভেতরে চিপ বসানো থাকে। বিষয়টি ভীষণ স্পষ্ট এবং সে কারণেই ভিএআর হস্তক্ষেপ করেছে। ব্যক্তিগত মতামতের কোনো জায়গা নেই। বলের ভেতরে চিপ পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে যে মাতানোভিচের স্পর্শ লেগেছিল এবং সেটি হওয়ার মুহূর্তে পাসালিচ অফসাইড ছিলেন।’