তসলিম শিমুল
, যশোর
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম রঙিন হয়ে উঠবে হলুদ, নীল আর লালের দাপটে। কারণ আজ রাতে (বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল) বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে নামছে দক্ষিণ আমেরিকার আগুনে দল কলম্বিয়া। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার ব্ল্যাক স্টারস ঘানা। ঘড়ির কাঁটা যখন বাংলাদেশ সময় সকাল ৭:৩০ ছুঁবে, তখনই শুরু হবে লা ত্রিকোলরের ইতিহাস গড়ার লড়াই।
কলম্বিয়ার জার্সির ভার আছে। এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রক্ত, চোখের জল আর গৌরবগাথা। এদিন মাঠে নামার আগে ফাউস্তিনো এসপ্রিলার সেই বুনো দৌড়, কার্লোস ভালদেরামার সেই সোনালি চুলের জাদু আর আন্দ্রেস এসকোবারের নীরব শোক, সবকিছু যেন কলম্বিয়ার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে।
এসপ্রিলা শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভয়কে ড্রিবল করে কাটিয়ে দিতে হয়। ভালদেরামা শিখিয়েছিলেন একটা পাস দিয়েই কীভাবে পুরো স্টেডিয়ামকে চুপ করিয়ে দিতে হয়। আর এসকোবার, ১৯৯৪-এর সেই ট্র্যাজেডি কলম্বিয়াকে শিখিয়েছে ফুটবল শুধু একটা খেলা নয়, এটা একটা জাতির হৃদয়। সেই ক্ষত বয়ে নিয়েই কলম্বিয়া বারবার ফিরে আসে।
২০২২ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা ছিল একটা দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু ২০২৬ সালে নেস্তর লরেঞ্জোর শিষ্যরা যেন সেই সব পুরনো প্রেতাত্মাদের কাঁধে নিয়ে বদলা নিতে এসেছে। গ্রুপ কে থেকে তারা উঠেছে একেবারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে। উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে কষ্টের জয়, আর সবশেষে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে গোলশূন্য রেখে দেওয়া। তিন ম্যাচে অপরাজিত থেকে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, এবারের কলম্বিয়া আগের চেয়ে অনেক ধারালো।
এই দলের হৃদস্পন্দন লুইস দিয়াজ। বায়ার্ন মিউনিখের এই উইং জাদুকর যেন মাঠের মধ্যে ঝড়। গত মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ২৬ গোল, ২৩ অ্যাসিস্ট করার পর বিশ্বকাপেও তার পা কথা বলছে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল আর অ্যাসিস্ট করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই মঞ্চে তিনি নিছক আগন্তুক নন।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, জেমস রদ্রিগেজ। ২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ী এই অধিনায়কের বয়স হয়েছে, কিন্তু পায়ের জাদু এতটুকুও কমেনি। কঙ্গোর বিপক্ষে এক ম্যাচেই তিনি পাঁচটি গোলের সুযোগ তৈরি করে ছুঁয়েছেন কার্লোস ভালদেরামার ৩৮ বছরের পুরনো রেকর্ড। অভিজ্ঞতার ভার তার কাঁধে, আর স্বপ্নের ভার পুরো একটা জাতির।
আর সামনে দাঁড়াবেন লুইস জাভিয়ের সুয়ারেজ। চোট কাটিয়ে ফিট হওয়া এই স্ট্রাইকারের ওপর ভরসা রাখছেন কোচ। মাঝমাঠে জেফারসন লেরমার শক্তি আর গুস্তাভো পুয়ের্তার সৃজনশীলতা, পেছনে দাভিনসন সানচেজের দেয়াল। ড্যানিয়েল মুনোজ তো ডিফেন্ডার হয়েও এখন পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
কিন্তু ঘানা সহজ প্রতিপক্ষ নয়। থমাস পার্টের নেতৃত্বে তারা পাল্টা আক্রমণে ভয়ঙ্কর। জর্ডান আয়ু আর আন্তোয়ান সেমেনিওর গতি যে কোনো রক্ষণকে মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে। কলম্বিয়া বল পায়ে রাখবে, ঘানা সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। এটা হবে কৌশল বনাম শক্তির লড়াই।
২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল কলম্বিয়ার সর্বোচ্চ সাফল্য। এবার তারা চায় সেই সীমা পেরিয়ে যেতে। রাউন্ড অফ ৩২ পেরোলেই অপেক্ষা করছে সুইজারল্যান্ড। স্বপ্নটা বড়, পথটা কঠিন।
আজ রাতটা (বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টা) তাই শুধু একটা ম্যাচ নয়। এটা কলম্বিয়ার জন্য একটা ঋণ শোধের রাত। এসপ্রিলা, ভালদেরামা, এসকোবার- সবাই যেন আজ স্ট্যান্ড থেকে দেখবে। হলুদ জার্সি গায়ে দিয়ে লুইস দিয়াজ আর জেমসরা নামবেন সেই ঋণ শোধ করতে।