অনেকে বলবেন হালান্ড। কেউ বলবেন দুর্ভাগ্য। কিন্তু ম্যাচের ৯০ মিনিটের গল্প বলছে, ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি হেরেছে নরওয়ের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক যোদ্ধার কাছে। তার নাম অরইয়ান নিল্যান্ড।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই গিমারায়েসের পেনাল্টি ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন। এনদ্রিকের নিশ্চিত গোলও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বাঁচান। একটি দুর্দান্ত সেভ করতে গিয়ে গোলপোস্টে সজোরে ধাক্কা খান, কিন্তু ব্যথা উপেক্ষা করে আবার দাঁড়িয়ে যান নিজের জায়গায়। শেষ পর্যন্ত তার গ্লাভসে জমা পড়ে অবিশ্বাস্য সব সেভ! বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন গোলরক্ষকসুলভ আধিপত্য খুব কমই দেখা যায়।
আজকের এই নায়ক কিন্তু রাতারাতি তৈরি হননি।
ছোটবেলায় স্কিইং, হ্যান্ডবল আর ফুটবল- তিন খেলাতেই সমান প্রতিভাবান ছিলেন অরইয়ান নিল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন ফুটবলকে, আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তার জীবন।
স্থানীয় ক্লাব থেকে উঠে এসে যোগ দেন ইল হড-এ। তখন ক্লাবটি খেলতো নরওয়ের দ্বিতীয় বিভাগে। বড় কোনো তারকা ছিল না, আলোচনাতেও থাকতো না দলটি। কিন্তু ২০১২ সালের নরওয়েজিয়ান কাপ বদলে দেয় সবকিছু।
ফাইনালে সবাইকে অবাক করে শিরোপা জিতে নেয় ছোট্ট ক্লাবটি। ম্যাচজুড়ে অবিশ্বাস্য সব সেভ করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন নিল্যান্ড। দ্বিতীয় বিভাগের এক গোলরক্ষকের এমন পারফরম্যান্স পুরো নরওয়েকে চমকে দেয়। সেই ম্যাচই ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড়।
এরপর শুরু হয় ইউরোপের পথচলা। নরওয়ে ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। একসময় সুযোগ পান ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব অ্যাস্টন ভিলায়। শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক। প্রথম একাদশে জায়গা করে নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছিলেন।
কিন্তু ভাগ্য সবসময় তার সঙ্গে যায়নি। ভয়াবহ অ্যাকিলিস টেন্ডন ইনজুরি তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিটকে দেয়। একজন গোলরক্ষকের জন্য এমন চোট থেকে ফিরে আসাই কঠিন। এর মধ্যেই অ্যাস্টন ভিলা নতুন পরিকল্পনায় দলে নিয়ে আসে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে। নিল্যান্ড ধীরে ধীরে কোচের পরিকল্পনার বাইরে চলে যান। অবশেষে ২০২০ সালে দুই পক্ষের সম্মতিতে শেষ হয় তার ভিলা অধ্যায়।
এরপর শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। নরউইচ সিটি, বোর্নমাউথ, রিডিং, আরবি লাইপজিগ- এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোথাও নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি, কোথাও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, আবার কোনো সময় কাটাতে হয়েছে ক্লাব ছাড়াই। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, অরইয়ান নিল্যান্ডের ক্যারিয়ার এখানেই শেষ।
কিন্তু ভাইকিংরা এত সহজে হার মানতে শেখেনি। ২০২৩ সালে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সেভিয়া তাকে সুযোগ দেয়। প্রথমে ছিলেন ব্যাকআপ গোলরক্ষক। কিন্তু সুযোগ পেয়েই প্রমাণ করেন নিজের সামর্থ্য। ধীরে ধীরে প্রথম একাদশে জায়গা পাকা করেন এবং লা লিগায় দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি ফ্রি এজেন্ট।
আর আজ, বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই মানুষটিই নিজের দক্ষতা দেখালেন। হালান্ড গোল করেছেন, নরওয়ে জিতেছে। কিন্তু ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বেশি যে নামটি উচ্চারিত হয়েছে, সেটি অরইয়ান নিল্যান্ড।
কারণ কিছু জয় শুধু গোলদাতাদের নয়, কিছু জয় লেখা হয় গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্ভীক প্রহরীর হাতে।
বারবার পড়েও যিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, বারবার হারিয়েও লড়াই চালিয়ে গেছেন। অরইয়ান নিল্যান্ড সত্যিই এক যোদ্ধা।
ভাইকিংদের রক্তে লড়াই লেখা থাকে। আর সেই লড়াইয়ের জীবন্ত প্রতীক অরইয়ান নিল্যান্ড।