সাইফুল ইসলাম কবির
, বাগেরহাট
সুন্দরবনের উপকূলে চারদিকে অথৈ জলরাশি। তারই মাঝখানে জেগে থাকা দুবলার চর। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে এখানে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। কেউ জাল-নৌকা নিয়ে উত্তাল সাগরে ছুটছেন, কেউ সদ্য ধরা মাছ নিয়ে ফিরছেন চরে। কেউ মাছ বাছাই করছেন, কেউ চাতালে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শুকানোর জন্য।
পাঁচ মাসের জন্য এই নোনা জলের জনপদে এসে ঘর বাঁধেন জেলেরা। সাগরের ঢেউ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই চলে তাদের জীবন।
বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা বাগেরহাটের দুবলারচর এখন শুঁটকি মৌসুমে সরগরম।
প্রতি বছর অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত হাজারো জেলে, মহাজন ও শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই দ্বীপ। সাগর থেকে আহরিত বিপুল পরিমাণ মাছ এখানেই প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি করা হয়। এরপর যায় দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দুবলারচরসহ আশপাশের কয়েকটি চরে নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতের অনুমতি দেওয়া হয়। আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া, শেলারচর ও মেহেরআলীর চরে মূলত শুঁটকি তৈরির কাজ চলে।
সাগর থেকে মাছ ধরে এনে প্রথমে প্রজাতি অনুযায়ী বাছাই করা হয়। এরপর কোনো মাছ চাতালে বিছিয়ে, আবার কোনো মাছ বাঁশের মাচায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই মাছ শুকিয়ে শুঁটকিতে পরিণত হয়।
জেলে মিরাজ শেখ বলেন, তেলফ্যাসাসহ ছোট মাছ চাতালে শুকানো হয়। আর লইট্টা ও ছুরি মাছ বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়।
মহাজন ইসমাইল হোসেন বলেন, এখান থেকে শুঁটকি বিভিন্ন পরিবহনে রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় যায়। দেশের শুঁটকির বড় একটি অংশ দুবলারচর থেকে সরবরাহ হয়।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শুঁটকি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন কোটি ২২ লাখ টাকা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, শুঁটকি তৈরির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক অস্থায়ী ঘর ও ডিপো নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রূপচাঁদা ও লাক্ষা মাছের শুঁটকি এবং অন্যান্য সাধারণ মাছের শুঁটকির জন্য পৃথক হারে রাজস্ব আদায় করা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এত বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়নে সরকারি অবকাঠামো ও পৃষ্ঠপোষকতা খুবই সীমিত।
রামপালের শুঁটকি ব্যবসায়ী ইমরান ফরাজী বলেন, ‘এই খাত থেকে সরকার বিপুল রাজস্ব পেলেও সরকারি উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা খুব বেশি নেই। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জেলে ও মহাজন অভিযোগ করেন, দাদনদাতা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। ঋণ নেওয়ার পর মাছ বিক্রির ক্ষেত্রেও তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় মাছের ন্যায্য দাম পান না। দাদনের কারণে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছেই মাছ বিক্রি করতে হয়।
দুবলারচরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় জেলেদের একাংশের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কামাল উদ্দিন আহমেদের নাম। তাদের দাবি, মাছ ধরার অনুমতি, মাছ বিক্রি, ব্যবসা ও চরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব রয়েছে।
তবে, কামাল উদ্দিন আহমেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলেদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছি। জেলেরা নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারেন। কোনো চাঁদা দিতে হয় না।
দুবলারচর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহ্লাদ চন্দ্র রায় বলেন, ঘর নির্মাণসহ মাছ প্রক্রিয়াজাতের জন্য ১৫ জনের নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। লোকজন নিয়ে তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কোনো বিচ্যুতির বিষয়ে আমাদের কাছে এখনও কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।