ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
যশোর সদর উপজেলার নোঙরপুর মাঠে আগাম জাতের বাঁধাকপিতে ভাইরাসের আক্রমণ ও সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
জমির বাঁধাকপি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন কৃষক। একইসঙ্গে সার-কীটনাশকের বাড়তি দাম, উৎপাদন খরচ এবং মাটি পরীক্ষাসহ কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে তাদের।
নোঙরপুর এলাকার কৃষক সায়েদ আলী চার বিঘা জমিতে ‘প্রফিট প্লাস’ জাতের আগাম বাঁধাকপি চাষ করেছিলেন। শুধু বীজ কিনতেই তার খরচ হয়েছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ মোট খরচের অঙ্ক ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। কিন্তু ভাইরাসের আক্রমণ ও আবহাওয়ার কারণে তার সমুদয় ফসল নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
সায়েদ আলী বলেন, ফসল নষ্ট হওয়ায় নতুন করে চাষ করার মতো অর্থও হাতে নেই। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। সরকারি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা পেলে আবারও চাষে ফিরতে পারবেন বলে জানান এই কৃষক।
কৃষক রঞ্জন আহমেদ বলেন, বাঁধাকপির গাছ কুঁকড়ে যাচ্ছে, বড় হচ্ছে না এবং শিকড়ও ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে না। ভাইরাস ও মাটির সমস্যার কারণে কী করণীয়, তা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কৃষক মোহাম্মদ গোলাপ নবী জানান, তার দেড় বিঘা জমির বাঁধাকপি নষ্ট হয়েছে। সার, মাটি ও অন্যান্য উপকরণে খরচ করার পরও ফসল নষ্ট হওয়ায় নতুন করে চাষ শুরু করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
কৃষক মজাহার বিশ্বাস, কামরুজ্জামান ও মোহাম্মদ জামির সরদারও আবহাওয়া, ভাইরাস ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ফসল উৎপাদনে সার ও কীটনাশকের খরচ বাড়লেও সবজির ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না।
কৃষক জহুরুল জানান, তার ৩ বিঘা জমির বাঁধাকপিও ভাইরাসে নষ্ট হয়েছে। বাজারে সবজির দাম কম এবং সার-কীটনাশকের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকরা। মাটি পরীক্ষায় সমস্যার কথা জানা গেলেও কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরামর্শ চান।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি সার নির্ধারিত দামে পাওয়া গেলেও অনেক সময় বাকিতে কিনতে গেলে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি মাটি পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ ও রোগবালাই শনাক্তকরণে কৃষকদের আরও সরাসরি সহযোগিতা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা জানান, যশোর সদরের ইছালী, চূড়ামনকাটি ও হৈবতপুর ইউনিয়নে বাঁধাকপির চাষ বেশি হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে বাঁধাকপি চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইছালী ইউনিয়নেই ১৪ হেক্টর জমিতে ইতোমধ্যে আবাদ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে ইছালী ইউনিয়নের নোঙরপুর মাঠে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায় চার বিঘা জমির বাঁধাকপির চারা নষ্ট হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে এবং কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে ফের চারা রোপণ করলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নোঙরপুরের মাঠ বাঁধাকপি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গত বছরও ওই মাঠে প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে বাঁধাকপি চাষ হয়েছিল। কৃষকরা এক মৌসুমে টানা তিনবার পর্যন্ত বাঁধাকপি তুলে থাকেন। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় জমি থেকেই পাইকারি দরে ফসল বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
ফসলের ভালো ফলন ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষিবিভাগ নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কৃষি অফিস জানায়, যেকোনো ফসল চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করা খুবই জরুরি। এর আগে নোঙরপুর মাঠে যখন প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে করোলা চাষ হয়, তখনও মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। বর্তমানে বাঁধাকপি চাষিদের জমি থেকেও মাটি সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, রোগাক্রান্ত জমিতে দ্রুত কার্যকর পরামর্শ, মাটি পরীক্ষা এবং কৃষি উপকরণের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতি কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তারা।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে এলে নতুন করে চারা রোপণের মাধ্যমে এখানকার কৃষকরা চলতি মৌসুমের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারবেন।