শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোল বন্দরে পণ্য খালাস ও রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ এবার জাতীয় সংসদেও উঠেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা মুন্নি সংসদে বেনাপোল বন্দরের অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এর পর বিভিন্ন শেডে পণ্য খালাস, পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনিয়মের অভিযোগ একটি শেড বা চালানে সীমাবদ্ধ নয়। ২৯, ৪১, ৪২, ৩০, ২৮, ১৫, ১৭ ও ১২ নম্বর শেড ঘিরে বিভিন্ন সময়ে পণ্য খালাস, পরীক্ষণ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ঘোষণার চেয়ে বেশি পণ্য থাকা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য বা পরিমাণ গোপন, উচ্চ শুল্কের পণ্যের বদলে কম শুল্কের পণ্য ঘোষণা এবং শুল্ক পরিশোধের আগেই পণ্য বের করে নেওয়া প্রভৃতি।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২৯ নম্বর শেডের। গত ৮ সেপ্টেম্বর ওই শেড থেকে তিন ট্রাক পণ্য শুল্ক পরিশোধ না করেই বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ট্রাক তিনটিতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের কসমেটিকস, ব্লেড, শাড়ি ও থ্রি-পিস ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ট্রাকগুলোর নম্বর—যশোর ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো ট-২০-৮৩৪৯ ও ঢাকা মেট্রো ট-২২-৭৪৭১।
ঢাকার মৌলভীবাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা ওই পণ্যচালানের খালাসের দায়িত্বে ছিল প্রত্যয় এন্টারপ্রাইজ নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। তিন ট্রাক পণ্য বের হওয়ার ঘটনায় ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। তবে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের বিষয়।
ঘটনার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
২৯ নম্বর শেডের ঘটনা সামনে আসার পর অন্য শেডগুলোর অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে। ১২ নম্বর শেডে একটি ইমিটেশন পণ্যের চালান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, চালানটিতে ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় বেশি পণ্য থাকার তথ্য থাকলেও কম পরিমাণ পণ্য পরীক্ষণ দেখিয়ে খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ৩০ নম্বর শেডের একটি চালান নিয়েও।
৬ সেপ্টেম্বর বন্দরে আসা ইমিটেশন পণ্যের একটি চালান ৮ সেপ্টেম্বর কাগজপত্রের ভিত্তিতে শুল্ক আদায়ের পর খালাস দেওয়া হয়; যেখানে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ওই চালানের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল চাঁদ এন্টারপ্রাইজ। চালানটির ঘোষিত পরিমাণ, পরীক্ষণ প্রতিবেদন, শুল্কায়ন ও খালাসের সময়ের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া ৪১, ২৯, ২৮, ১২, ১৫, ১৭, ৪২ ও ৩০ নম্বর শেডে বিভিন্ন সময়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে মিথ্যা ঘোষণা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য ও পরিমাণ গোপন, উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্য ঘোষণা এবং দ্রুত পরীক্ষণের মাধ্যমে পণ্য খালাসের অভিযোগ রয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানেও বড় ঘাটতির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ছয় হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি চার হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ আদায় হয়েছে।
আটক পণ্য নিয়ে প্রশ্ন
আটক পণ্য ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও একটি ঘটনা সামনে এসেছে। চলতি বছরের ২৪ মে জারি করা একটি চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থায়ী আদেশের আলোকে বেনাপোল কাস্টম হাউসে আটক ত্রাণযোগ্য পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভাণ্ডারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তালিকায় ছিল তিন হাজার ২২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রি-পিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল ও আটটি ওড়না। সব মিলিয়ে পণ্য ছিল তিন হাজার ৫৫৯টি।
গুদাম কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে পণ্য হস্তান্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার সঙ্গে কাস্টমসের একজন কর্মচারীকেও ঢাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ত্রাণসামগ্রী পরিবহনের কথা বলে দুটি কাভার্ড ভ্যানে বিপুল পরিমাণ প্রসাধনসামগ্রী বোঝাই করে পাচারের চেষ্টা করা হয়। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিজিবি একটি কাভার্ড ভ্যানসহ তিনজনকে আটক করে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বেনাপোল কাস্টম হাউসের নিলাম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি, কাভার্ড ভ্যানের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসান।
সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স নিয়েও অভিযোগ
সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ব্যবস্থাপনাও অভিযোগের বাইরে নয়। কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, নিজের লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে পণ্য খালাসের কাজ করছেন। তাদের অভিযোগ, এভাবে একটি চক্র অনিয়মের সুযোগ নিচ্ছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, হাতেগোনা কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত। তাদের সুযোগ দিতে নামমাত্র ও দ্রুত সময়ে পরীক্ষণ প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে। পুরনো কর্মকর্তারা নতুন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও এই চক্রে টানার চেষ্টা করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
জিয়াউর রহমান আরও বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড পরীক্ষা করলে ঘুস লেনদেনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। অতীতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ধরা পড়া পণ্যচালান পর্যালোচনা করলে ব্যবহৃত লাইসেন্সের তথ্যও পাওয়া যাবে। একই শেডে নামানো অ্যাসোর্টেড গুডসের কয়েকটি চালান ১০০ শতাংশ কায়িক পরীক্ষণ করলে অনিয়ম ধরা পড়তে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আব্দুর রহমান, সেলিম হোসেন, মুক্তাদির ও সোবহান হোসেনসহ কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, নিজের লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ অনিয়মের জন্য অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নেন। কাস্টমস ও বন্দরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এভাবে অনিয়ম করা সম্ভব নয় বলে তাদের দাবি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন শেডে পণ্য পরীক্ষণ, শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, একটি চক্র পণ্য খালাসের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে থাকা পণ্যের অসঙ্গতি, কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা, দ্রুত পরীক্ষণ এবং শুল্ক পরিশোধের আগেই পণ্য বের করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, সোহেল রানা ও তরিকুল ইসলামের নাম অভিযুক্তের তালিকায় উঠে এসেছে। একইভাবে বেনাপোল স্থলবন্দরের ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আসমাউল শান্ত, ট্রাফিক পরিদর্শক নাহিদুল ইসলাম এবং শেড ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী লিংকনের নামও আলোচনায় রয়েছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বের আওতাধীন পণ্য পরীক্ষণ, শেড ব্যবস্থাপনা, গুদাম ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শাকিল আহমেদসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ ও ধরন যাচাইয়ে শিথিলতা, দ্রুত পরীক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি এবং ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের অমিল থাকা সত্ত্বেও খালাসের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব অভিযোগ সত্য হলে পুরো শুল্কায়ন ও পণ্য খালাস ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন ওঠে এবং সরকারের রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এসব প্রসঙ্গে কথা হয় বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক রুহুল আমিনের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরা সিসিটিভি ক্যামেরাসহ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি। এর সঙ্গে আমার দপ্তরের কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, সে যেই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, ‘আমি দায়িত্বে আসার পর মিথ্যা ঘোষণা ও অনিয়মের জন্য ১২টি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স বাতিল করেছি। ৪৬ জনকে আসামি করে তিনটি ফৌজদারি মামলা করেছি। কেউ অনিয়ম করলে কোনো ছাড় নয়।’
সংসদেও উঠেছে অভিযোগ
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সাবিরা সুলতানা মুন্নি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বন্দর সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে।
কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি পণ্য চুরি, আমদানি করা পণ্য এন্ট্রি না করা (নো এন্ট্রি), পণ্যের সঠিক তথ্য না দেওয়া, ডিজিটাল স্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, মিথ্যা ঘোষণা ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরেন। এসব অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপও দাবি করেন তিনি।