রায়হান সিদ্দিক
, যশোর
যশোরের বিভিন্ন গ্রামে গাভী ছাড়াই ‘দুধ’ তৈরি হচ্ছে এবং তা বিপণনের মাধ্যমে ভোক্তার ঘরে যাচ্ছে- একথা এখন সবার জানা। কিন্তু আতঙ্কের কথা হলো, এই তথাকথিত দুধ আড়ংসহ শীর্ষস্থানীয় চেইনশপ কর্তৃপক্ষ কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে অধিক নিরাপত্তার স্বার্থে সামর্থবান মানুষেরা দুধের নামে যা কিনে নিজে পান করছেন বা শিশুদের পান করাচ্ছেন, তা বিষেরই নামান্তর।
গত ৬ এপ্রিল যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভেরচি ঘোষপাড়ায় র্যাব, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর যৌথ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে সরকারি এই দলটি দেখতে পায়, কোনো কোনো বিক্রেতা গাভী ছাড়াই তথাকথিত দুধ উৎপাদন করে তা বাজারজাত করছেন। এই তথাকথিত দুধ আবার কিনছে বড় বড় কোম্পানি। চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির প্রমাণ এর আগেও মেলে সরকারি অভিযানে। কিন্তু জালিয়াতরা নিবৃত হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যশোরের আট উপজেলায় বিভিন্ন কোম্পানির অর্ধশত দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১টি কেন্দ্র রয়েছে ব্র্যাকের, যাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হলো ‘আড়ং’। মণিরামপুর এবং কেশবপুরে নয়টিসহ অন্যান্য উপজেলায় ১২টি কেন্দ্র থেকে নিয়মিত দুধ সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে জালিয়াতরা। অভিযানে আটক স্থানীয় ব্যবসায়ী অপু ঘোষ স্বীকার করেছেন, মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ করে এক কেজি সিলিকন জেল দিয়ে তিনি প্রায় দশ কেজি নকল দুধ তৈরি করেন। ইউটিউব দেখে শেখা এই কৌশলে উৎপাদিত বিষাক্ত তরল তিনি নিয়মিত আড়ং, প্রাণ ও আকিজের মতো বড় কোম্পানির কাছে বিক্রি করে আসছেন। যৌথ এই অভিযানে নকল দুধ উৎপাদনের কাঁচামালসহ আটক হন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গত দুই বছরে এই এলাকায় ভেজাল দুধ উৎপাদনের রমরমা ব্যবসা জমিয়েছেন।
একই কথা জানিয়েছেন দেব ঘোষ। তিনিও দীর্ঘদিন যাবৎ কেমিক্যাল দিয়ে দুধ উৎপাদন করে আসছেন। দেব বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ১৫ থেকে ২০ জন ঘোষ আছে, যারা নিয়মিত এইভাবে দুধ উৎপাদন করেন। এখানে ব্র্যাকের একটি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র আছে, সেখানে আমরা এগুলো বিক্রি করি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুধ পরীক্ষা করা হয়, কিন্তু একটা সিস্টেম করে নিয়েছি আমরা। ওই মাসিক সিস্টেম আর কি! যার কারণে ভেজাল দুধ হোক আর কেমিক্যাল দিয়ে বানানো হোক, পরীক্ষায় সব গরুর খাঁটি দুধ হয়ে যায়।’
আর তথাকথিত দুধ তৈরির এসব কাঁচামাল তিনি সংগ্রহ করেন যশোর শহরের ভোলানাথ ও বিনিময় স্টোর থেকে, জানান তিনি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কোম্পানিগুলোর এভাবে ভেজাল দুধ সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রাও। তারা বলছেন, কোনো ব্যবসায়ী যদি অনৈতিক কাজ করে থাকেন, তাহলে তিনি যতটা অপরাধী, একই রকম অপরাধী এই কোম্পানিগুলো।
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ কবীর বলেন, ‘নিয়ম মেনে কোম্পানির প্রতিনিধিরা দুধ সংগ্রহ করলে ভেজাল দুধের কারবার থাকতো না। কারণ তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভেজাল বা ক্ষতিকর দুধ চিহ্নিত করে ফেরত দিলে ব্যবসায়ীরা এই পন্থা থেকে সরে আসতো। কিন্তু আমরা ভিন্ন চিত্র দেখছি। এজন্য দুপক্ষই সমান অপরাধী।’
এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
এদিকে, যৌথ অভিযান চলাকালে ব্র্যাকের দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রের কেমিস্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন স্থানীয় কয়েক ব্যবসায়ী। তারা দাবি করেন, কেমিস্টসহ কয়েকজনের সহযোগিতায় এই অবৈধ কারবার চলছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কেমিস্ট মামুনের প্রাতিষ্ঠানিক সনদ পরীক্ষা করতে চাইলে তা দেখাতে পারেননি তিনি। পাশাপাশি মামুন নিজেকে কখনো ‘কেমিস্ট’ আবার কখনো ‘ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন।
অভিযোগের বিষয় এবং মামুনের সঠিক পরিচয় জানতে সুবর্ণভূমির পক্ষ থেকে ব্র্যাকের এই বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। এরিয়া ম্যানেজার মামুনুর রশিদ বলেন, সাক্ষাৎ ছাড়া তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না।
তবে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর কেশবপুরের ফুড সেফটি অফিসার সুশান্ত দত্ত জানিয়েছেন, কেমিস্ট পরিচয় দেওয়া মামুনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট নেই। ব্র্যাকের নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টারে খণ্ডকালীন ট্রেনিং নিয়ে তিনি দুধের মান পরীক্ষা করছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
তিনি বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য আইনের ৩৯ ধারা মোতাবেক আমরা লাইসেন্স দিয়ে থাকি। তবে অভিযুক্ত মামুনের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি।’
বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যানুযায়ী, যশোরে বিভিন্ন কোম্পানির ৫০টি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে আড়ংয়ের ২১টি, আকিজের ১২টি, প্রাণের ১১টি, মিল্ক ভিটার পাঁচটি ও সফলের একটি। আট উপজেলায় সবচেয়ে বেশি দুধ সংগ্রহের কেন্দ্র রয়েছে ব্র্যাক তথা আড়ংয়ের। এগুলোর অবস্থান যশোর সদরে তিনটি, ঝিকরগাছায় তিনটি, শার্শায় তিনটি, মণিরামপুরে ছয়টি, কেশবপুরে তিনটি, বাঘারপাড়ায় দুটি, চৌগাছায় একটি। অভিযোগ রয়েছে, এসব কেন্দ্রের আশেপাশে একাধিক নকল দুধ উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আড়ংয়ের দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রের এক কর্মচারী জানান, নকল দুধ উৎপাদনকারীদের সাথে মাঠ পর্যায়ের কয়েকজনের যোগসাজশে এই অবৈধ কারবার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। দুধ পরীক্ষা করে নেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে পরীক্ষা করা হয় না বলেও তিনি জানান। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবহিত নন বলে তার দাবি।
যশোরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কোম্পানির এই দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র কোন নিয়মে গড়ে উঠেছে বা সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান এগুলো পর্যবেক্ষণ করে তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এই কেন্দ্রগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত।
জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাঝে মাঝে তদারকি করি। কিন্তু তাদের লাইসেন্স দেওয়া আমাদের কাজ না। সম্ভবত এটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত এবং সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য সনদ দিয়ে থাকেন। তবে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আমরা অভিযান চালাই।’
এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে ভিন্ন কথা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান বলেন, এই দুধ ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে আমাদের সরাসরি এক্সেস নেই। তবে আমরা খোঁজ-খবর রাখি। কিন্তু এখানে যে অবৈধ কারবার চলছে সেগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলিকন জেল এবং কস্টিক সোডা মূলত শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত দুটি ভয়ানক রাসায়নিক, যা কোনোভাবেই মানবদেহের জন্য উপযোগী নয়। সিলিকন জেল সাধারণত কলকারখানার যন্ত্রপাতি পিচ্ছিল করতে বা বিভিন্ন পণ্য জোড়া দেওয়ার কাজে সিল্যান্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুধে এই রাসায়নিকটি মেশানোর মূল উদ্দেশ্য হলো দুধের ঘনত্ব বাড়ানো। যখন পানির সাথে এই জেল এবং ফ্যাট মেশানো হয়, তখন এটি হুবহু খাঁটি ও ঘন দুধের রূপ নেয়, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা প্রায় অসম্ভব। এটি একটি অজৈব পদার্থ হওয়ায় মানুষের পরিপাকতন্ত্র এটি গ্রহণ বা হজম করতে পারে না, ফলে এটি পাকস্থলীর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা চিরতরে নষ্ট করে দেয়।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, কস্টিক সোডা বা সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড হলো একটি তীব্র ক্ষারীয় পদার্থ, যা সাবান ও ডিটারজেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা এটি দুধে মেশায় মূলত প্রিজারভেটিভ হিসেবে, যাতে দীর্ঘক্ষণ দুধ টক বা নষ্ট না হয়। কস্টিক সোডা এতোটাই শক্তিশালী যে এটি মানুষের চামড়া বা মাংস পুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যখন এটি দুধের সাথে মিশিয়ে পান করা হয়, তখন এটি মানুষের খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর ভেতরের নরম আস্তরণকে পুড়িয়ে ফেলে মারাত্মক ক্ষত বা আলসারের সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই দুই রাসায়নিকের মিশ্রণ মানবদেহের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। এগুলো রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে পড়লে কিডনি এই বিষাক্ত পদার্থগুলো ছেঁকে বের করতে পারে না। যার ফলে অতি দ্রুত কিডনি বিকল হয়ে যায়। সিলিকন জেল লিভারে জমা হয়ে লিভার সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করে। এই ‘সাদা বিষ’ দীর্ঘদিন গ্রহণের ফলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভয়াবহ; এটি তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে ভেতর থেকে অকেজো করে দেয়। সহজ কথায়, সিলিকন জেল ও কস্টিক সোডা মিশ্রিত দুধ পান করা মানে হলো নিজেকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
এদিকে, অভিযানে ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ এর ৪২ এবং ৪৩ ধারা অনুযায়ী খাদ্যে ভেজালের অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, গোবিন্দ ঘোষের দুধের কারখানায় অভিযান চালিয়ে দুধে ভেজালের অভিযোগ প্রমাণ পাওয়ায় তাকে পাঁচ হাজার টাকা এবং গাভী ছাড়া শুধুমাত্র রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার করে দুধ উৎপাদনের অপরাধে অপু ঘোষকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, এই জাতীয় ভেজাল খাদ্য দীর্ঘদিন খাওয়ার ফলে শরীরে বিভিন্ন জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। এমনকি মারণব্যাধি ক্যানসারও হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
‘এখানে উৎপাদিত দুধ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিক্রি করা হয় বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অবৈধ এই কারবারের সাথে জড়িত সকলের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ যোগ করেন সেলিমুজ্জামান।
র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি প্রিন্স বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি কেশবপুরের ভেরচি ঘোষপাড়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধ পন্থায় ভেজাল শিশুখাদ্য তৈরি করছে। পরে ভোক্তা অধিকার এবং নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে আমরা যৌথ অভিযান চালিয়ে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি। আইন অনুযায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাবের এ জাতীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে গত ৯ মার্চ কেশবপুরের পাঁজিয়ায় র্যাবের অভিযানে ভেজাল দুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করা হয়। গরুর দুধে জেলি, সয়াবিন তেল ও সোডা মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির অপরাধে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।