যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্মৃতির পটে শহীদ জিয়ার উলাশী: প্রধানমন্ত্রীকে বরণে উদগ্রীব শার্শা

রাব্বি আল-আমিন

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ১১ এপ্রিল,২০২৬, ০৫:০০ পিএম
আপডেট : শনিবার, ১১ এপ্রিল,২০২৬, ০২:১৪ এ এম
স্মৃতির পটে শহীদ জিয়ার উলাশী: প্রধানমন্ত্রীকে বরণে উদগ্রীব শার্শা

যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী যদুনাথপুর খাল বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে এই খালের মাটিতে কোদাল চালিয়ে দেশের ঐতিহাসিক ‘স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন’ কর্মসূচির সূচনা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান।

দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খালটি ভরাট হয়ে গেছে, মিলছে না কোনো সুফল। দীর্ঘ ৫০ বছর পর সেই ঐতিহাসিক জনপদে আবারও বইছে প্রাণের হাওয়া। শহীদ জিয়ার উত্তরসূরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৭ এপ্রিল এই খালটি পুনর্খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করতে আসতে পারেন এমন খবরে উলাশীসহ পুরো শার্শায় এখন উৎসবের আমেজ। স্থানীয়দের দাবি, তারেক রহমান যেন সশরীরে এসে এই খাল পুনর্খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর উলাশী অংশ থেকে শুরু হওয়া এই খালটি এক সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অভিশাপ ‘জলাবদ্ধতা’ দূর করতে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জিয়া খাল’ নামেই পরিচিত।

কথিত আছে, উদ্বোধনের দিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৬ মাইল পথ হেঁটে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে এই খালের উপকারিতা বুঝিয়েছিলেন। তার এক ডাকে হাজার হাজার মানুষ কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেদিনের সেই উন্নয়ন বিপ্লবে।

উলাশী খাল পুনর্খনন করবে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এরই মধ্যে চার কিলোমিটার খাল পুনর্খননের জন্য প্রায় এক কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে দরপত্র দেওয়া হয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। এই খালটি পুনর্খনন হলে শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ১৭২ গ্রামের সাধারণ মানুষের সুফল পাবে। উত্তর শার্শার সোনামুখি ও বনমান্দারসহ ২২টি বিলের হাজার হাজার একর জমিতে পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে ফসল ফলবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটাবে।

‘জিয়া খাল’ পুনর্খনন কার্যক্রম উদ্বোধনে চলতি মাসের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যশোর সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে সামনে রেখে পুরো শার্শায় বিরাজ করছে উচ্ছ্বাস- উদ্দীপনা।

উলাশী খাল পুনর্খননের উদ্বোধন সফল করতে শনিবার (১১ এপ্রিল) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের খালটি পরিদর্শন করার কথা। স্থানীয় গণ্যমান্য এবং শহীদ জিয়ার সাথে খাল খননে অংশ নেওয়া প্রবীণদের সাথে প্রতিমন্ত্রী মতবিনিময় করবেন বলে জানান যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৭ এপ্রিল বিশেষ বিমানযোগে বেলা ১১টায় যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছুবেন। পরবর্তীতে সড়কপথে উলাশী খাল পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন শেষে যশোর সার্কিট হাউজে বিশ্রাম নেবেন। বিকেল তিনটায় শহরের শংকরপুরে যশোর মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যা হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উদ্বোধন এবং কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জনসভায় যোগ দেবেন। জনসভাশেষে বিমানযোগে ঢাকায় পৌঁছুবেন।

শহীদ জিয়ার যুগান্তকারী কর্মসূচি
ষাটের দশকের কৃষিতে যে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সেচ। এই সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজলভ্য এবং টেকসই করার জন্য জিয়াউর রহমান যুগান্তকারী কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এই জনপ্রিয় কর্মসূচি হলো খাল খনন। একসময় যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় লাখ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে বন্ধ থাকতো চাষাবাদ। এ পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে শার্শার এই খালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে খনন করা হয়। আশপাশের খাল ও জলাধারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি গড়ে তোলে কার্যকর পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক। খালটির মাধ্যমে দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় কৃষিতে আসে বড় পরিবর্তন। পানির নিচে থাকা জমিতে শুরু হয় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ, বাড়ে উৎপাদন এবং উন্নত হয় কৃষকদের জীবনমান।

সমগ্র দেশে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই কর্মসূচিতে জনগণের সঙ্গে তিনি নিজেও অনেক জায়গায় অংশ নিয়েছেন। দেড় বছরে সারাদেশে দেড় সহস্রাধিক খাল খনন ও পুনর্খনন করেন।

স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম ও সেনা সদস্যদের সহযোগিতায় প্রায় চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্য উলাশী খালটি খনন করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর।

এই খাল খননের মাধ্যমে ওই এলাকার মানুষের উপকার হয়েছিল, হয়েছিল সবুজ বিপ্লবও। যা আজ মৃতপ্রায়। মুছতে বসেছে জিয়াউর রহমানের উদ্বোধনের ফলকের চিহ্নটুকুও। সেসময় এটি ‘উলাশী-যদুনাথপুরের বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প’ নামেও পরিচিত ছিল। অর্ধশত বছরের সেই ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ আজ অস্তিত্ব সংকটে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ধ্বংস হয়ে গেছে উলাশী জিয়া মঞ্চও। এমনকী তিনি যে ঘরে রাতযাপন করেছিলেন, সেই ঘর আজ অস্তিত্বহীন। গত ৫০ বছরে কেউ খোঁজ নেয়নি এ খাল, মঞ্চ কিংবা ঘরের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খননের ঘোষণায় এ খালটি ফের আলোচনায় এসেছে।

আগামী ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঐতিহাসিক খাল পরিদর্শনে আসতে পারেন- এমন খবরে উলাশীসহ পুরো শার্শায় বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘন ঘন পরিদর্শনে আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা।

হাতেম মোল্লাদের স্মৃতি
শহীদ জিয়ার স্নেহধন্য উলাশী সংলগ্ন যদুনাথপুর বাক গ্রামের হাতেম মোল্লা (৭৫) আজ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু স্মৃতি আজও প্রখর। তিনি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, ‘জিয়াউর রহমান যখন খাল কাটতে এলেন, আমি এক সেনা সদস্যের পায়ের ফাঁক দিয়ে তাকে দেখি। তিনি প্রথমে খালে নেমে নিজ হাতে কোদাল নিয়ে মাটি কাটা শুরু করেন। পাশের ঝুড়িতে মাটি ভরে তৎকালীন ডিসি মহিউদ্দিনের (মহিউদ্দিন খান আলমগীর) মাথায় তুলে দেন। তারপর হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, আনসার, ভিডিপি ও সেনা সদস্য মাটি করা শুরু করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান পরিদর্শন করার সময় যখন আমার কাছে, সেইসময় এক সেনা শহীদ জিয়াকে বললেন- স্যার এই বাচ্চাটা আপনার সাথে দেখা করার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছে। তখন তিনি (শহীদ জিয়া) আমাকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকায় কেনা গরু আর বাছুর বড় করে আজ আমি ৬১ শতক জমির মালিক। তিনি আমার কাছে এক দেবতুল্য মানুষ।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে খালটি সংস্কারের অভাবে ভরাট হয়ে যায়। তারই ছেলে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুনছি সশরীরে এখানে এসে খালটি পুনর্খনন করবেন। এতে এলাকায় মানুষের অনেক উপকার হবে। এই খালে চাষীদের উন্নয়নের জন্য আবার পাম্প মেশিন চলবে। বাবার স্মৃতি রক্ষা করতে ছেলে সশরীরে এসে এই খাল খনন করবেন, শেষ বয়সে এসে দেখবো, ভাবিনি। দেখতে পারলে অনেক খুশি হবো।

আমেদ আলী নামে আরেক প্রবীণ জানান, জলাবদ্ধতার কারণে এলাকায় ধান- পাট কিছুই হয় না। বিলগুলো সবসময় পানিতে ডুবে থাকতো। জিয়াউর রহমান এই দৃশ্য দেখে খাল কাটার উদ্যোগ নেন। খাল কাটার পাশাপাশি সেই সময় চাষীদের জন্য ১১টি সেচ মেশিন দেয়া হয়। আর ভূমিহীনদের জন্য ১১টি ভ্যান। এর মধ্যে তার বাবাও একটি ভ্যান পায়। খাল খননের পর পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় এলাকার সাধারণ মানুষ ও চাষীদের ভাগ্যের অনেক উন্নয়ন হয়েছিল।

মনিরুজ্জামান নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এই অঞ্চলকে কৃষিনির্ভর করার জন্য জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই খাল খনন করেন। এর ফলে এই অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটে। পরবর্তীতে তদারকির অভাবে এই খাল এখন মৃতপ্রায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘ ৫০ বছর সংস্কার না হওয়ায় ঐতিহাসিক এই খালটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ। ভরাট হয়ে যাওয়ায় আবারও দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। তবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খননের বিশেষ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে উলাশী খালের পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খালটি খননের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি খালের দখলদারত্ব ও অবৈধ দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সরকার এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ, কষ্টের স্থায়ী সমাধানের জন্য আরো ১৯টি অভ্যন্তরীণ খাল পুনর্খননের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)