বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের বিস্তীর্ণ জনপদের প্রাণ-প্রকৃতি, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। পানির অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু নদ-নদী। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে কৃষি উৎপাদনের খরচ। উজানের পানির অভাবে সাগর থেকে উঠে আসা লোনা পানি ক্রমশ উত্তরের জমি গ্রাস করছে। পানীয় জলের অভাবে উপকূলীয় এলাকা ছাড়ছে মানুষ। লাখো মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। জলবায়ু হয়ে উঠছে চরমভাবাপন্ন।
গাঙ্গেয় অববাহিকার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এই অঞ্চলের জনজীবন ও প্রাণ-প্রকৃতি গঙ্গা-পদ্মা এবং এর শাখা-প্রশাখার পানির ওপর নির্ভরশীল। সুপ্রাচীন কাল থেকে এই অঞ্চলের মানুষের মূল জীবিকা কৃষি। কিন্তু গঙ্গার ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ ১৯৭৫ সালে চালু করার পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ক্রমে পানিশূন্য হতে থাকে। এরপর থেকে দেখা দিতে থাকে নানা ধরনের বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়া।
সেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঠিক মধ্যবর্তী জেলা যশোর সফরে আসছেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরের প্রথম কর্মসূচিই হলো উলাশী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন; যে খালটি তার পিতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজহাতে কোদাল নিয়ে খনন করেছিলেন। এবং উলাশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের মাধ্যমেই শহীদ জিয়ার যুগান্তকারী কাজ ‘খাল খনন কর্মসূচি’ দেশজুড়ে বিস্তৃত ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ হলো খাল-বিল, নদী-নালায় ভরপুর দেশ। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই দেশে নতুন করে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার দরকার হলো কেন? এর প্রধান কারণ উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাস। কোনো প্রাকৃতিক কারণে এটি হয়নি। অভিন্ন নদী গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয় সমস্ত আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চল দ্রুতই মরুকরণের দিকে ধাবিত হয়। তখন ফসলের ক্ষেতে সেচ দেওয়ার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প ছিল না।
দূরদর্শী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দ্রুতই এই কঠিন বাস্তবতা ধরে ফেলেন এবং তিনি ভারতের আইনবিরুদ্ধ এই কাজের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিরোধ গড়তে আন্তর্জাতিক মহলের শরণাপন্ন হন। এমনকি তিনি ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে বাংলাদেশের ভয়াবহ পরিবেশগত অর্থনৈতিক বিপর্যয় ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩১তম অধিবেশনে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এছাড়া তিনি ফারাক্কাবিরোধী জনমত গঠন, যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। এরই ফলে ১৯৭৭ সালে ভারত প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
এইসব গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাবেই সন্তুষ্ট থাকেননি জিয়া, তিনি পরিবেশ বিপর্যয়রোধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে ভূউপরস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার এই কাজ শুরু হয় ফারাক্কা ব্যারাজের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল দক্ষিণ-পশ্চিমের যশোর থেকে।
জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারগুলো অজ্ঞাত কারণে এই পরিবেশঅনুকূল কর্মসূচি থেকে সরে আসে। তারা বরং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েই চলে এবং এর গুরুতর কুফল অচিরেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তার শহীদ বাবার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে নির্বাচনি ইশতেহারে স্থান দেন। সরকার গঠনের অল্পদিনের মধ্যেই তিনি অন্যান্য কাজের পাশাপাশি প্রায় সাড়ে চার দশক পর খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করেন। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ তিনি যশোরে এমন এক স্থানে খাল কাটতে আসছেন, যেখানে তার বাবার স্মৃতি আজও জ্বলজ্বল করছে।
বিলুপ্ত বহু নদী, ধুঁকছে অনেকগুলো
পদ্মায় পানি না থাকায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীর ওপর। এই অঞ্চলের নদীগুলোর পানির প্রধান উৎস পদ্মা। বিশাল এই নদীর প্রধান দুই শাখা গড়াই/মধুমতি ও মাথাভাঙ্গা শুষ্ক মৌসুমে কার্যত পানিশূন্য হয়ে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শতাধিক নদ-নদীর মরণদশা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘতম নদী ভৈরব ও কপোতাক্ষ, কুমার, চিত্রা, বেত্রাবতী (বেতনা), হরিহর, ভদ্রা, ফটকি, নবগঙ্গা, মুক্তেশ্বরী, কোদলা, টেকা, বেগবতী প্রভৃতি। এই নদীগুলোর বেশিরভাগ শুষ্ক মৌসুমে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। আবার পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় জমে যাওয়া পলিতে বর্ষায় দু’কূল উপচে ফসলি জমি ভাসিয়ে দেয়। ছোট স্রোতধারার মধ্যে বেতনা, আফ্রা, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, হাপরখালী, কোদলা, শ্রী, হরি, টেকা, হাকর, আতাই, কোদালিয়া, আমড়াখালি, দায়তলা প্রভৃতি নদী হয় অস্তিত্ব হারিয়েছে, অথবা বিলুপ্তির পথে আছে। পানিশূন্য এসব নদীর বুকে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে কৃষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সেচ) আব্দুল্লাহ আল রশিদ মনে করেন, নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ার প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধ। তিনি বলেন, ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদের প্রাণ-প্রকৃতি, নদ-নদীর ওপর ভীষণ বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এখন এই অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, শুধু গঙ্গাই নয়, এই অঞ্চলের আরেকটি প্রধান নদী ভৈরবেও বাঁধ দিয়ে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ভারতের হাদড়াগাড়িতে এই বাঁধটি দেওয়া হয়েছে।
নৌ-যোগাযোগ কার্যত বিলুপ্ত
দেশের অন্যান্য স্থানের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সভ্যতা, শহর-নগর-বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে নদী তীরবর্তী স্থানে। হাজার বছর ধরে এসব জনপদে যাতায়াত ও বাণিজ্যের প্রধান পথ ছিল নদী। কিন্তু পানির অভাবে নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন নৌযোগাযোগ মূলত বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার কিছু এলাকায় সচল আছে। নড়াইল ও যশোরের দক্ষিণাংশে কিছু নৌযান চললেও তা মূলত পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ভৈরব নদে নাব্য সংকটের কারণে যশোরের নৌবন্দর নওয়াপাড়ায় বড় নৌযান আসতে পারে না। সেখানে ছোট ছোট নৌযানে পণ্য পরিবহন করায় খরচ ও সময় বেশি ব্যয় হয়। সামগ্রীকভাবে নৌযোগাযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তার স্থান দখল করেছে মূলত সড়ক যোগাযোগ। এর ফলে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ।
প্রাণ-প্রকৃতি ও নদী আন্দোলনের বর্ষীয়ান নেতা অনিল বিশ্বাস বলেন, ‘এই তো সেদিন ১৯৮১ সালে, কপোতাক্ষ নদে চলাচলরত লঞ্চে চেপে ঝিকরগাছা থেকে গঙ্গানন্দপুর গেছি। ১৯৯১ সালে বাঁকড়া বাজার থেকে কপোতাক্ষের তাজা ইলিশ কিনেছি। একথা বিশ্বাস করতে আজকের প্রজন্মের কষ্ট হবে। আমাদের চোখের সামনে মরে গেল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘতম নদ কপোতাক্ষ।’
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নমুখী
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঠিক মাঝখানের জেলা যশোর। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ২০টি নদী। পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশকুমার ব্যানার্জী জানান, নদীগুলো মজে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা সেচের জন্য ভূউপরিস্থ পানি পায় না। ফলে ফসল বাঁচাতে তাদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফল হচ্ছে মারাত্মক। দিন দিন পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ফলে চাষাবাদের খরচ বাড়ছে হু হু করে।
বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সেচ) জানান, এই অঞ্চলে মাটির ২৫ ফুট গভীরে পানির স্তর থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলা যায়। কিন্তু এবার শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পানির স্তর গড়ে প্রায় ৩১ ফুট নীচে নেমে যায়। ফি বছরই এমনটি হচ্ছে। ফলে অগভীর নলকূপে পানি ওঠে না। বিএডিসি ও চাষিরা বাধ্য হয়ে মাটি খুঁড়ে মোটর স্থাপন করে। এতে বিপুল টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।
বিএডিসির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হেডকোয়ার্টার যশোর শহরের কাছে চাঁচড়া এলাকায় অবস্থিত। সেখানে স্থাপিত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সংগৃহীত রেকর্ড বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঠিক মাঝখানের এই জনপদে ২০০১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৫ দশমিক ৮৬ মিটার নীচে। এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধে তা ৬ ও মের দ্বিতীয়ার্ধে তা ৪ দশমিক ৪৮ মিটার নীচে ছিল। এর ঠিক ২০ বছরের মাথায় ২০২১ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ভূগর্ভস্থ পানির এই স্তর নেমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮৬, ৭ দশমিক ৮৪ ও ৬ দশমিক ৩২ মিটার নীচে। অর্থাৎ ২০ বছরের ব্যবধানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ মিটার বা ৫ দশমিক ৮১ ফুট। পানিস্তরের এই দ্রুত নিম্নুমুখিতা অশনিসংকেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই এলাকার শহরের বাসিন্দারা অগভীর নলকূপে একেবারেই পানি পায় না। তাদের হয় পৌরসভার সাপ্লাই পানি না হয় নিজস্ব সাবমার্সিবল পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন জানান, মাত্র এক দশক আগেও হস্তচালিত অগভীর নলকূপ চেপে মানুষ পানীয় জলসহ গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহার্য্য পানি পেত। এখন তা শুধু ইতিহাস।
পানিতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততা, কমছে ফসলি জমি
উজান থেকে পানির প্রবাহ ক্ষীণ হয়ে পড়ায় দক্ষিণে বঙ্গোসাগরের পানি ক্রমশ উত্তরের দিকে উঠে আসছে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি ও মাটি এখন মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত। এর ফল হয়েছে অতিমারাত্মক।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ যাচাইয়ের জন্য ২০০৯ সালে একটি ব্যাপকভিত্তিক জরিপ করে। পরের বছর সেই জরিপের প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির ৩০ শতাংশের বেশি উপকূলীয় এলাকায়। ২ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন হেক্টর উপকূলীয় ভূমির মধ্যে ১ দশমিক ০৫৬ হেক্টর জমি লবণাক্ততার শিকার। শুষ্ক মৌসুমে এসব জমি অনাবাদি থাকে। উপকূলীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শস্যক্ষেত, চাষাবাদের ঘনত্ব, উৎপাদন, মানুষের জীবনমান দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে নীচে।
সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির মতে, যেসব কারণে দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে তার মধ্যে প্রধান হলো উজানের পানি (গঙ্গা) প্রত্যাহার। ফারাক্কার কারণে গাঙ্গেয় অববাহিকায় সর্বোচ্চ লবণাক্তার প্রকোপ দেখা গেছে।
সংস্থাটির মধ্যে ১৯৭৩ সালে আট লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর, ২০০০ সালে দশ লাখ ২০ হাজার হেক্টর এবং ২০০৯ সালে দশ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততার শিকার ছিল। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার আগে ১৯৭৩ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে (৩৬ বছরে) দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর বা ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ জমি নতুন করে লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সম্প্রতি ফের ব্যাপকভিত্তিক জরিপ করেছে। এর ফলাফল শিগগির প্রকাশিত হওয়ার কথা।
পানীয় জলের হাহাকার
গেল কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমের তিন জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকায় পানীয় জলের জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আইলা ও সিডরে উপকূলীয় বাঁধ তছনছ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ পানীয় জলের সংকটে পড়ে অবর্ণনীয় কষ্টে আছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, খুলনার কয়রা, পাইকগাছাসহ আশপাশের এলাকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ওই অঞ্চলে এক কলস পানযোগ্য পানি সংগ্রহ করতে গৃহবধূদের মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হয়।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জরিপ রিপোর্ট বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিমের ছয় জেলার ৩৫ পয়েন্টের ভূগর্ভস্থ পানি (শ্যালো মেশিনে উত্তোলিত) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, লবণাক্ততার পরিমাণ শূন্য দশমিক ৩৯ থেকে ১৯ দশমিক ৮ ডেসিসিমেন/মিটার। এর মধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ৮৩ শতাংশ নলকূপের পানি পানের অযোগ্য। খুলনার পাইকগাছায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলিত পানির ৫০ শতাংশ পানের অযোগ্য।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বাঁশঝাড়িয়া বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, তাদের এলাকায় পানযোগ্য পানি সবচেয়ে মূল্যবান।
জমি উর্বরতা হারাচ্ছে, খরচ বাড়ছে কৃষিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর নদীসমূহ সারাবছর যে পলি বয়ে আনে, তার সিংহভাগই বহন করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাওয়া তিনটি নদীÑ পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা। এই তিন প্রধান স্রোতধারার শাখা-প্রশাখাগুলোর বহন করা পলি জমি উর্বর করে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর কারণে পদ্মার পলি বহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমেছে। এর ফলে জমি প্রাকৃতিক উর্বরতা হারাচ্ছে। এখন রাসায়নিক সার ব্যবহার ছাড়া কোনো জমিতে কার্যত ফসল চাষ করা সম্ভব না বলে মনে করেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. জাভেদ হোসেন খান।
দক্ষিণ-পশ্চিমের বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সাত জেলা বরাবরই চাহিদার তুলনায় বেশি ফসল উৎপাদন করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের (অধীনস্থ জেলা যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা) মতে, এই এলাকায় ধান ছাড়াও গম, পাট, নানা ধরনের ডাল, সবজি প্রভৃতি ফসলের ব্যাপক আবাদ হয়। বিশেষ করে দেশের বাজারে থাকা সবজির প্রায় অর্ধেকই যশোর ও ঝিনাইদহ জেলায় উৎপাদিত। ইদানীং উঁচু ভূমিগুলোতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে নানা ধরনের ফল চাষ হচ্ছে।
এক সময় নদী-খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকায় চাষিরা সেউচির (অযান্ত্রিক পদ্ধতি) মাধ্যমে জমিতে সেচ দিত। কিন্তু ভূউপরিস্থ পানির সংকটের কারণে গেল শতাব্দীর আশির দশকে মূলত ভূগর্ভস্থ সেচ ব্যবস্থা চালু হয়। যন্ত্রনির্ভর এই সেচ ব্যবস্থা ব্যাপক ব্যয়বহুল। এর ফলে বেড়েছে কৃষি উৎপাদনের খরচ, বেড়েছে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দামও।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি গ্রামের ধান চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা বোরো ধান উৎপাদনে জমিভেদে দুই থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত সেচ খরচ লাগে।
উপজেলার ইছাপুর গ্রামের সবজি চাষি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিমসহ অন্যান্য সবজি উৎপাদনে বিঘাপ্রতি অন্তত পাঁচ হাজার টাকা সেচ খরচ হয়।
নারায়ণপুর গ্রামে পাঁচ একর জমিতে ড্রাগনের বাগান আছে আল হেলাল মিঠুর। তিনি বলছেন, ড্রাগন ক্ষেতে শুষ্ক মৌসুমে গড়ে আড়াই হাজার টাকা সেচ খরচ হয়। মাল্টা, কমলা, পেয়ারা, কুল প্রভৃতি ফল উৎপাদনেও প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ হয় সেচ বাবদ।
কৃষিবিদদের মতে, ফসলের মাঠে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করলে জমির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। ভূগর্ভস্থ পানি জমির উর্বরা শক্তি কমায়। ফলে ভালো ফসল উৎপাদন করতে কৃষককে এখন সারসহ নানা খাতে বিপুল টাকা খরচ করতে হয়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ও বিএডিসি কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করলে মাটির উপরিভাগে আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজসহ নানা উপাদান জমে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে। এছাড়া লবণাক্ত পানির ব্যবহারও জমিকে নিষ্ফলা করে দেয়। সম্প্রতি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা বাঁওড়ের পানি সেচ দিয়ে চাষিদের জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ে। পরে বিএডিসি ওই সব জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
জলাবদ্ধতা
যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মণিরামপুর উপজেলার মধ্যবর্তী একটি এলাকার নাম ‘ভবদহ’। এই ভবদহকে যশোর-খুলনার অভিশাপ বলা হয়। গেল শতকের আশির দশক থেকে ভবদহ-সংলগ্ন যশোরের ওই তিন উপজেলা, খুলনার ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার তালা জলাবদ্ধতার শিকার।
পানি আন্দোলনের প্রবীণ সংগঠক অনিল বিশ্বাস মনে করেন, ভবদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার নানা কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান দুটি কারণ হলো, সত্তরের দশকে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে উজানের পানি প্রত্যাহার এবং ষাটের দশকে তখনকার ওয়াপদা কর্তৃক উপকূলজুড়ে অসংখ্য বাঁধ, পোল্ডার, স্লুইচগেট নির্মাণ। এর ফলে উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সাগরের লোনা পানির প্রবাহ দেশের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ; যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নদীগুলো পলি পড়ে মজে যাওয়া।
ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা থেকে লাখো মানুষকে মুক্তি দিতে এবং মজে যাওয়া নদীগুলো খননে পানি উন্নয়ন বোর্ড শত শত কোটি টাকা খরচ করেও সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। জলাবদ্ধ এলাকায় ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন প্রতি বছর কমছে। উপকূল থেকে বিস্তৃত হতে হতে এখন যশোর-নড়াইল অঞ্চলও হাজার হাজার লোনা পানির চিংড়িঘেরে ছেয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশকুমার ব্যানার্জী বলেন, প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করলে সমস্যা হবেই। গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহার করায় স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো লাইভ (জীবন্ত) থাকেনি।
বিপন্ন প্রাণ-প্রকৃতি
ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমের নদ-নদী পানিশূন্য হওয়া ও লোনা পানির বিস্তারের কারণে বিপর্যয় ঘটছে প্রাণ-প্রকৃতি, উদ্ভিদের। বাস্তুচ্যুত হচ্ছে লাখো মানুষ। ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স (পরিবেশগত ভারসাম্য) নষ্ট হওয়ায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে বহু প্রাণীর অস্তিত্ব হয় বিলুপ্ত হয়েছে, অথবা বিলুপ্তির সংকটে পড়েছে। হারিয়ে গেছে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হরেক পেশা। হাজার রকমের স্বাদু পানির মাছের জন্য বিখ্যাত অঞ্চলটিতে এখন দেশি মাছ নেই বললেই চলে। হারিয়ে গেছে বিখ্যাত ‘যশুরে কই’। কৃত্রিমভাবে চাষের মাধ্যমে হাতেগোনা কিছু দেশি মাছ রক্ষা করা গেলেও তা আগের স্বাদ হারিয়েছে।
যবিপ্রবির পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজনীন নাহার বলেন, লবণাক্ততার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে জনসংখ্যার স্থানচ্যুতি ও স্থানান্তর ঘটছে। আবাসস্থলের ক্ষতি হওয়ায় অনেক প্রজাতির প্রাণী বিপন্ন এমনকি বিলুপ্তির মুখোমুখি হচ্ছে।
‘গবেষণায় দেখা গেছে, উজানের মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সাগরের লোনা পানির ক্রমবর্ধমান চাপে কার্প, ক্যাটফিশসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছের বৈচিত্র্য ইতিমধ্যে ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে,’ বলছেন ড. নাজনীন।
এদিকে ভূমি ও পানির উপর নির্ভর করে উপকূলের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনার যে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছিল তা বিপন্ন হয়েছে। এখন এই অঞ্চলের অল্পকিছু চিংড়ি ও কাঁকড়ার ঘের মালিকের দখলে বিস্তীর্ণ ভূমি। তাদের হাতে বিস্তর টাকা। আর পেশা হারিয়ে কৃষক-জেলে বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটছে শহর-নগরে। দেশের হাজার হাজার ইঁটভাটার বেশিরভাগ শ্রমিক সাতক্ষীরা উপকূলের বাসিন্দা। খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের শহরগুলোর মজুরেরাও মূলত উপকূলীয় অঞ্চলের পৈত্রিক পেশাহারা মানুষ।
জলবায়ু হয়ে উঠছে চরমভাবাপন্ন
একসময়ের সুজলা-সুফলা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কার্যত মরুময়। জলবায়ু হয়ে উঠেছে চরমভাবাপন্ন। শীত মৌসুমের বেশিরভাগ দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে যশোর ও চুয়াডাঙ্গায়। আবার গ্রীষ্মকালে বেশিরভাগ দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে এই দুই জেলায়।