বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে আলেম-উলামা, মাদরাসাছাত্রসহ নিরস্ত্র যেসব মানুষকে হত্যা করা হয়, তাদের একজন ছিলেন যশোরের হাফেজ মো. মোয়াজ্জেমুল হক ওরফে নান্নু হুজুর। মৃত্যুর আগে তিনি স্বজনদের বলে গিয়েছিলেন, কথিত যুদ্ধাপরাধ মামলায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষী হওয়ায় তাকে টার্গেট করে হত্যা করে পুলিশ।
মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুর সন্তানরা এই তথ্যসহ, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে চিকিৎসায় বাধাদান করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এবং সবশেষে তড়িঘড়ি দাফনে বাধ্য করার পৈশাচিক ঘটনার বর্ণনা দেন। তবে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত পুলিশ সদস্যদের সন্ধান না পাওয়ায় অভিযোগের সত্যতা মেলানো দুরুহ।
বাবার মৃত্যুর আগে তার কাছ থেকে শোনা ঘটনার বর্ণনা দেন মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুর দুই মেয়ে উম্মে সুমাইয়া ও উম্মে সাদিয়া।
সুমাইয়া বলেন, ‘আমার বাবা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন। মধ্যরাতে ব্ল্যাকআউট করে সেখানে হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময় বাবা পালিয়ে কাকরাইল মসজিদের কাছে চলে যান। সেখানে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দেয়। এরপর শরীরের বাম পাশে পেট ও বুকের মাঝখানে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে ফেলে রাখে। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে সেখানে লোকজন জড়ো হয়। এর মধ্যে এক তরুণ আব্বুকে ঘাড়ে উঠিয়ে একটি থ্রিহুইলারে উঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ তখন থ্রিহুইলারটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আব্বুর মোবাইল ফোনও পুলিশ সদস্যরা নিয়ে যায়। পরে ওই তরুণ অনেক বাধা পেরিয়ে আব্বুকে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে আব্বু ওই তরুণের ফোন ব্যবহার করে স্বজনদের খবর দেন। ’
আরেক মেয়ে উম্মে সাদিয়ার বর্ণনা, ‘‘আব্বুকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসা দেওয়া যায়নি। পুলিশ হাসপাতালটিতে হানা দিয়ে শাপলায় আহত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে থাকে। আব্বুকে মৃতদের সাথে মর্গে পাঠিয়ে দেয়। কিছু সময় পর আমার ফুফাতো ভাই আশিকুর রহমান ওরফে আল আমিন মর্গে পৌঁছে দেখে, আব্বুর হাত নড়ছে। অর্থাৎ আব্বু বেঁচে আছে। আল আমিন দ্রুত মর্গ থেকে আব্বুকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বারডেম, ইবনে সিনা, লালমাটিয়ার আল-মানার হাসপাতালে নিয়ে যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া আব্বুকে কোথাও বাঁচানোর আশ্বাস পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা পর তার চিকিৎসা শুরু হয়। ততক্ষণে আমরা দুই বোনও ঢাকায় পৌঁছে যাই। মিলেনিয়াম হার্ট অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ছয়দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। আমরা বুঝতে পারি, ওই হাসপাতালেও গোয়েন্দাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ১০ মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরামর্শ দেন, ‘আহত ব্যক্তির বাঁচার তো কোনো আশা নেই, বরং এখানে থাকলে পুলিশ লাশও নিয়ে যাবে। আপনারা বরং তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।’ এই পরামর্শমতো ওই দিন বিকেলে আব্বুকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে যশোরের বাড়ির দিকে আনা হয়। পথে সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে আব্বু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।’’
মরদেহ গভীর রাতে যশোর শহরের খড়কি এলাকার বাড়িতে পৌঁছানোর পর শুরু হয় পুলিশের আরেকদফা অত্যাচার। সাদিয়ার ভাষ্য, “পুলিশের একজন অফিসার এসে বলেন, ‘তোমরা বলো, তোমাদের বাবা দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তাহলে তোমাদের এক লাখ টাকা দেওয়া হবে।’ তবে আমরা পুলিশের এই প্রস্তাবে রাজি হইনি। আমার বড় বোন বলে, ‘আমার বাবা ইসলাম রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। দুর্ঘটনার কথা বলতে পারবো না।”
ভোরে হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসী নান্নুর খড়কি এলাকার বাড়িতে জড়ো হন। তখনও পুলিশ বিনা গোসলে নান্নুর লাশ মাটিচাপা দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করছিল। কিন্তু উপস্থিত জনতার তোপের মুখে পুলিশ পিছু হটে। তবে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে সকাল দশটায় নামাজে জানাজার ঘোষণা বাতিল করতে বাধ্য হন তারা। সকাল সাতটায় সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ মাঠে জানাজা শেষে নান্নুকে দাফন করা হয় বাড়ির পাশে খড়কি গোরস্থানে।
প্রতিবেশী মেহেদী হাসান মিঠু সেই রাতেই জানাজা ও কবর দেওয়ার জন্যে প্রশাসনের চাপাচাপির কথা বর্ণনা করেন। বলেন, আত্মীয় ও প্রতিবেশীকে না জানিয়ে দ্রুত কবর দেওয়ার তীব্র চাপ থাকলেও পরদিন বেশ সকালে এম এম কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুল মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন।
এই নিপীড়নের সময় যশোর জেলা পুলিশের এসপি ছিলেন জয়দেব ভদ্র। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
টার্গেট কিলিংয়ের অভিযোগ
জামায়াতে ইসলামী যশোর জেলা শাখার আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল এমপি জানান, ১৯৬৯-৭০ সালের দিকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী থাকতেন যশোর নূতন উপশহর এ ব্লকের একটি বাসায়। তিনি সেই সময় বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য দিতেন। উপশহরের ওই বাড়িতে থাকার সময়ই প্রতিবেশী মো. মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুসহ তার পরিবারের সঙ্গে আল্লামা সাঈদীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে আল্লামা সাঈদী যশোরের বাঘারপাড়ায় থাকলেও পিরোজপুরে গণহত্যার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করে ফ্যাসিবাদী সরকার গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। এই মামলায় আল্লামা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষী ছিলেন হাফেজ নান্নু।
মেয়ে উম্মে সাদিয়া এই তথ্য সমর্থন করে বলেন, ‘‘সাঈদী হুজুরের ছেলে বুলবুল সাঈদী ছিলেন আব্বুর বন্ধু। সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় শুধু আমার বাবা নন, দাদা, দাদি, বড় ফুফুও সাক্ষী ছিলেন। এই কারণেই আব্বুকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে আব্বুর যতক্ষণ জ্ঞান ছিল, তিনি আমাদের সব বলে গেছেন। জানিয়েছেন, গুলি করার আগে পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেছিল, ‘তুই তো সাঈদীর মামলার সাক্ষী। তোকে অনেকক্ষণ ধরে অনুসরণ করছি। আর বাঁচতে পারবি না।”
২০১৩ সালের ৫ মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার হাজার হাজার সদস্য শাপলা অভিযানে অংশ নেয়। ঠিক কোন কর্মকর্তা হাফেজ নান্নুকে গুলি করে হত্যা করে তা এখন উদ্ধার করা কঠিন।
হাফেজ নান্নুর পরিচয়
যশোর নূতন উপশহর এ ব্লকের মরহুম মো. শহীদুল ইসলাম ও হামিদা খানমের সন্তান মোয়াজ্জেমুল হক নান্নু; যিনি হাফেজ নান্নু বা নান্নু হুজুর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্ত্রী শাহনাজ বেগম ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে থাকতেন শহরের খড়কী এলাকার নিজস্ব আরেকটি বাড়িতে। শাহনাজ বেগম গতবছর ৯ সেপ্টেম্বর মারা যান।
নিজ বাড়ির একটি ঘর ও পাশে একটি দোকানঘর ভাড়া নিয়ে দর্জির কাজ করতেন নান্নু। আর্থিকভাবে দরিদ্র হলেও ভদ্রলোক হিসেবে এলাকায় তার সুনাম ছিল।
এলাকার জামিয়া নুরিয়া মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মো. আয়াতুল্লাহ বলেন, হাফেজ নান্নু ছিলেন পরিশ্রমী, ভদ্র, ধার্মিক।
দুর্দশায় নান্নুর পরিবার
স্বামী হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর তিন দফা স্ট্রোকের পর শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন হাফেজ নান্নুর স্ত্রী শাহনাজ বেগম। কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিসসহ আরও নানা রোগে আক্রান্ত শাহনাজের কোমরের হাড়ও ভেঙে যায় পড়ে গিয়ে। তার বড় মেয়ে উম্মে হাবিবা ক্যানসারের রোগী। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় স্বামী তাকে ডিভোর্স দিয়েছেন। সন্তানসহ মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন এই অসহায় নারী। ছোট মেয়ে উম্মে সাদিয়ারও ডিভোর্স হয়ে যায়। তিনিও এক সন্তানসহ মায়ের কাছে এসে ওঠেন। ঢাকায় স্বামীর সংসারে মেজো মেয়ে উম্মে সুমাইয়া ও বড় ছেলে আবু হুজাইফা রাজধানীর একটি কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। অভাবের কারণে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি হুজাইফা। বাবার মৃত্যুর পর ছোট ছেলে কিশোর আবু হানজালারও স্ট্রোক হয়। বলতে গেলে পরিবারটির যশোরে থাকা প্রায় সবাই অসুস্থ। খরচ জোগাতে না পারায় ঠিকমতো চিকিৎসাও হয়নি। এই অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন নান্নু হুজুরের স্ত্রী।
উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় শহীদ নান্নুর পরিবারটি মূলত শুভাকাক্সক্ষীদের সাহায্য-সহানুভূতির ওপর টিকে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল জানান, হাফেজ নান্নু তাদের দলের সমর্থক ছিলেন। সেই দায়বোধের জায়গা থেকে তারা প্রতিমাসে পরিবারটিকে নির্দিষ্ট টাকা সহায়তা দেন। এছাড়া উৎসবের সময় নগদ টাকাসহ বাড়তি কিছু সহযোগিতাও করে দলটি।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকেও এককালীন অর্থ সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক পরিবারটির খোঁজ-খবর নেন।
হেফাজতের অন্যতম সংগঠক মাওলানা নাসিরুল্লাহ বলেন, ‘আমরা পরিবারটিকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে সহযোগিতা করেছি, ভবিষ্যতেও করবো। তবে পারিবারিক কিছু বিষয় আছে, যেগুলো মিটিয়ে ফেললে ভালো হয়।’
যশোর জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামও একটি সেলাই মেশিন, কিছু কাপড় ও নগদ টাকা সহায়তা দিয়ে যান তার দায়িত্বকালে।
এসব তথ্য স্বীকার করে পরিবারটির সদস্যরা বলছেন, এভাবে কতদিন চলা যায়! ছোট মেয়েটি শিক্ষিত। তার একটা চাকরি হলে পরিবারটি রক্ষা পেত।
আলাপকালে নান্নু হুজুরের মেয়ে উম্মে সাদিয়া তাদের এই দুর্দশার জন্য শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনকে দায়ী করেন। পরিবারটি শেখ হাসিনাসহ তার দল আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর খুনি সদস্যদের বিচার দাবি করে। শেখ হাসিনার পতনের পর হেফাজত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একটি একটি মামলা হয়। সেই মামলায় নান্নু হুজুরের দুই মেয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানান সাদিয়া।
শহীদ নান্নুর জীবিত একমাত্র ভাই শহরতলীর হাশিমপুরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমানও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চান।