যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আচমকা উচ্ছেদে গাছতলায় ঠাঁই

সহায়তার আশ্বাস জেলা প্রশাসকের

রায়হান সিদ্দিক

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ২৩ মে,২০২৬, ১০:০০ এ এম
আচমকা উচ্ছেদে গাছতলায় ঠাঁই

মুন্নী বেগম; বয়স ৮০ বছর। এই বৃদ্ধ বয়সেও খোলা আকাশের নিচে ছাউনি টাঙিয়ে বসে আছেন তিনি। একসময় এখানেই ছিল তার স্বপ্নের কুঁড়েঘর। চরম অভাব-অনটনের মাঝেও বিধবা মেয়ে আর নাতি-পুতিদের নিয়ে এখানেই বসবাস করছিলেন এই বৃদ্ধা।

কিন্তু গত ১০ ও ১১ মে যশোরে সরকারি খাস জমি উদ্ধার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান চালায় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। সেই অভিযানে মুন্নী বেগমের শেষ সম্বলটুকু গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সব হারিয়ে এখন গাছতলাই তার একমাত্র আশ্রয়।

বৃদ্ধা মুন্নী বেগম বলেন, ‘আমরা এখানে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছি। তারা যদি আমাদের উচ্ছেদই করতে চায়, তবে অন্তত একটা নোটিস দিতে পারতো, একটু সময় দিতে পারতো। কিন্তু তারা আমাদের এক ঘণ্টা সময়ও দেয়নি। এসে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।’

ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার পোতা (নাতি) ছেলের তখন ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষা চলছিল। ঘটনার দিন সে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। কেন্দ্র থেকে ফিরে এসে দেখে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’

অতীতের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের আমলে আমরা রেলগেট এলাকায় থাকতাম, সেখানে আমাদের নিজস্ব বাড়ি ছিল। যুদ্ধের সময় যখন লুটপাট শুরু হলো, তখন আমরা খোল্লা মসজিদে আশ্রয় নিই। সেখান থেকে রেড ক্রস আমাদের এই নিউমার্কেটে নিয়ে আসে। বিহারিদের খালি পড়ে থাকা ঘরগুলোতে প্রথমে আমরা সামান্য ভাড়ায় থাকা শুরু করি। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা এখানে আছি। এখন আমাদের থাকার মতো কোনো ঘর নেই। রাতে মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাচ্ছি না। পুতনি, নাতনিদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি। একটু ঘুমানোর জন্য অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। আমার দুই মেয়ের বাড়িও এখানে ছিল, সেগুলোও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন দিন-রাত না খেয়ে এই আমগাছের তলায় বসে থাকি।’

মুন্নী বেগমের মতো এমন অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন যশোর শহরের উপশহর এলাকার অন্তত ২৭টি পরিবার। দীর্ঘ ৩৫ থেকে ৪০ বছর যাবত উপশহর ইউনিয়ন পরিষদের পেছনের সরকারি জমিতে ঘর তুলে তারা বসবাস করছিলেন। উচ্ছেদ অভিযানে অনেকেই ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রায় সবকিছুই হারিয়েছেন। বর্তমানে প্রতিবেশীদের বাড়িতে কোনো রকমে রাত কাটছে তাদের। কারণ ‘বস্তিবাসী’ হওয়ায় অনেকেই তাদের নতুন বাসা ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না। আর এমন পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সন্তানদের লেখাপড়াও।

আরেক ভুক্তভোগী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমরা বস্তিতে থাকতাম বলে এখন আর কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাচ্ছে না। ছোট বাচ্চা আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে মানুষের বাড়িতে রাত কাটাচ্ছি। ছেলেমেয়ের বইখাতা সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ওরা আর পড়াশোনাও করতে পারছে না।’

আসমা বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘হাউজিংয়ের লোকজন অভিযান চালাবে ভালো কথা। সরকারের জায়গা সরকার নিয়ে নেবে, এতে আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমাদের একটু সময় দিলে অন্তত ঘরের মালামালগুলো বের করতে পারতাম। এখন আর আমাদের কিছুই নেই। কার কাছে যাব আমরা?’

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানে যখন এই মানুষগুলোর নির্মম দশা, তখনো একদল দুর্বৃত্ত সেই ভাঙা ঘরে লুটপাট চালিয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। মিন্টু হোসেন জানান, এমনভাবে বুলডোজার দিয়ে ঘরগুলো ভাঙা হয়েছে যে, একজনের ঘরের মালামাল আরেকজনের ঘরের মধ্যে চলে গেছে। ফলে কেউ নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করার সুযোগ পায়নি। আর সেই সুযোগে একদল দুর্বৃত্ত সব মালামাল লুটপাট করে নিয়ে গেছে।

এদিকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অভিযানে উচ্ছেদ হওয়া এই গৃহহীন মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে পুনর্বাসন করার সুযোগ আছে। বিভিন্ন এলাকায় সরকারিভাবে নির্মিত আমাদের বেশ কিছু ঘর খালি থাকে। তারা সেখানে যেতে রাজি হলে আমরা তাদের পাঠাতে পারি। আর বাচ্চাদের পড়াশোনার কোনো সমস্যা হচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ আমি এখনো পাইনি। তবে যদি কারো বইপত্রের সমস্যা বা আর্থিক সংকট থেকে থাকে, সে ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করবো।’

উল্লেখ্য, যশোরে দুই দিনের এই বিশেষ অভিযানে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। শহরের উপশহর, বাবলতলার নিউমার্কেট এবং ঢাকা রোডসহ বেশ কিছু ব্লকে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তবে সরকারি জমি উদ্ধার আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, কোনো বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া বছরের পর বছর ধরে বাস করা এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে আচমকা উচ্ছেদ করা কতটা মানবিক সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)