শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
জমে উঠছে যশোরের পশুর হাটগুলো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গরুর ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, ট্রাকভর্তি পশুর আগমন আর মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সাতমাইল পশুর হাট।
যশোরের শার্শা উপজেলার এ হাটে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের হাজার হাজার গরুর সমাগম ঘটেছে। কোরবানির ঈদকে ঘিরে হাটে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও কাক্সিক্ষত পাইকার ও বড় বড় ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা।
সাতমাইল পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, হাট ও সংলগ্ন এলাকাজুড়ে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা রয়েছে দেশি, শাহীওয়াল, ফ্রিজিয়ান, নেপালি ও বিভিন্ন শঙ্কর জাতের গরু। যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ভোরে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান ও নসিমনে করে পশু নিয়ে যান খামারিরা। কোথাও মাঝারি আকারের গরু ঘিরে দরদাম চলছে, কোথাও আবার বিশাল আকৃতির ষাঁড় দেখে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
হাটে ছোট গরু বিক্রি হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকায়। মাঝারি গরুর দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। বড় গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে দুই লাখ থেকে পাঁ লাখ টাকা পর্যন্ত। কয়েকটি বিশাল আকৃতির গরুর দাম ছয় থেকে আট লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় গরুর তুলনায় মাঝারি আকারের দেশি গরুর চাহিদা বেশি। কারণ সাধারণ ক্রেতারা এবার বাজেট হিসাব করে কোরবানির পশু কিনছেন।
তিনটা গরু নিয়ে সাতক্ষীরা থেকে হাটে এসেছিলেন খামারি জয়নাল আবেদিন। তিনি বলেন, এবার গরু লালন-পালনে খরচ অনেক বেড়েছে। আগে যে গরুর পেছনে ৮০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে এক লাখ ১০ হাজার টাকার বেশি লাগছে। খড়, ভুষি, খইল, ওষুধ, শ্রমিক- সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু বাজারে সেই তুলনায় দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ী আজগর আলী জানান, তিনি চারটি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। এর মধ্যে একটি গরুর দাম চেয়েছেন দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু ক্রেতারা সর্বোচ্চ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলছেন। তিনি বলেন, একটি গরু ছয়-সাত মাস ধরে লালন-পালন করেছি। এখন কম দামে বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি তুলতেও কষ্ট হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর ঈদের অন্তত তিন থেকে চার সপ্তাহ আগে থেকেই সাতমাইল হাট জমে ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় পাইকার এসে ট্রাকভর্তি গরু কিনে নিয়ে যান। তখন প্রতিটি হাটে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। কিন্তু এবার সাতমাইল পশুর হাটে পশুর সরবরাহ বেশি হলেও পাইকারদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
খুলনা থেকে আসা পাইকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাতমাইল হাটে ভালো মানের গরু পাওয়া যায়। কিন্তু এবার দাম তুলনামূলক বেশি। একই মানের গরু চৌগাছা হাটে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা কমে পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য অনেকে অন্য হাটে চলে যাচ্ছেন।
খামারিদের দাবি, খাবারে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই বেশি দাম চাইছেন। গত এক বছরে গরুর খাদ্যের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
শার্শার যদুনাথপুর গ্রামের খামারি রাজু আহমেদ বলেন, আগে ৫০ হাজার টাকায় যে গরু কিনতাম, এখন সেই গরু কিনতেই লাগে ৭০ হাজার টাকা। এরপর কয়েক মাস পালন করতে গিয়ে আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন বাজারে ভালো দাম না পেলে ছোট ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে পারবে না।
শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ১৬ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ১৩ হাজার ১০০টি। বিপরীতে উপজেলায় চাহিদা রয়েছে ১২ হাজার ৭২৬টি পশুর। ফলে এলাকায় পশুর কোনো সংকট নেই। উপজেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট এক হাজার ১১৩টি খামার রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত বড় খামারের সংখ্যা ১৫টি।
সাতমাইল পশুর হাট পরিচালনা কমিটির পক্ষে সোহেল আল মামুন বলেন, হাটে পর্যাপ্ত পশু উঠছে। ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। সামনে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তপু কুমার সাহা জানান, এ উপজেলায় হাটে আসা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভ পরীক্ষা ও অসুস্থ পশুর চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিষিদ্ধ উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা পশু বাজারজাত ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, যশোরের আট উপজেলায় মোট ১৯টি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদরে ছয়টি, মণিরামপুরে তিনটি, বাঘারপাড়ায় চারটি, অভয়নগরে দুটি এবং কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় একটি করে পশুর হাট রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর যশোরে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। জেলার চাহিদা এক লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। ফলে প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। বর্তমানে জেলায় খামারির সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০ জন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান বলেন, যশোরের পশু স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে যশোরের পশুর চাহিদা বেশি। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।