আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাতক্ষীরায় কোরবানির পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও এবার জেলায় প্রায় ১৮ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে, পশুখাদ্যের চড়া দামের কারণে শেষ মুহূর্তে বিনিয়োগ তুলে আনা নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির জন্য সাতক্ষীরার ১২ হাজার ৮৯৪টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৪৯ হাজারের বেশি, ছাগল ৪৪ হাজার এবং ভেড়া রয়েছে ৬ হাজার।
ভারতীয় গরু না আসায় বাজার পাওয়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি হলেও উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না খামারিদের। তথ্যমতে, গত এক বছরে গমের ভুষি, ভুট্টা ও সয়াবিন খইলসহ সব ধরনের পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলার খামারি মেহেদী হাসান জানান, পশুখাদ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে পশুর দাম আশানুরূপ না হলে বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
একই সুর আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা এলাকার মাঝারি খামারি মো. রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে। তিনি বলেন, হাটে একটা মাঝারি সাইজের গরু সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে প্রতিদিনের বাড়তি খোরাকি জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। এবার সাতক্ষীরায় পশুর অভাব নেই শুনছি, তাই প্রতিযোগিতা হবে ব্যাপক। ক্রেতারা যদি ন্যায্য দাম না দেন, তবে আমাদের আসল টাকাই উঠবে না।
সাতক্ষীরা সদরের জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তার খামারে বড় আকারের দুটি গরু রয়েছে, যেগুলোর দাম ধরেছেন আট লাখ টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজারে বড় গরুর আশানুরূপ ক্রেতা মিলবে কি না, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত।
এদিকে, কলারোয়া উপজেলার প্রান্তিক খামারি আমেনা বেগম এবার দুটি গরু ও তিনটি ছাগল হাটে তোলার জন্য প্রস্তুত করেছেন। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গরম ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশি কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকট ছিল। বাধ্য হয়ে চড়া দামে কেনা ফিড খাওয়াতে হয়েছে। বাজারে ক্রেতাদের পকেটের অবস্থা কেমন থাকবে -সেটাই এখন বড় চিন্তা। লাভ না হোক, অন্তত খাটুনির দামটুকু যেনো পাওয়া যায়।
সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও অনেক খামারি সম্পূর্ণ দেশি ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করে কিছুটা লাভের আশা করছেন। বকচরা গ্রামের খামারি মজনু মালি জানান, তার খামারের ১০টি গরুকে তিনি রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই দেশি ঘাস ও প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে বড় করছেন। কৃত্রিম ফিড কম ব্যবহার করায় খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন এবং তিনি ভালো দাম পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফএম মান্নান কবীর বলেন, জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত আছে। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধ থাকায় দেশি খামারিরা ভালো বাজার পাবেন বলে আশা করছি। অবৈধপথে সীমান্ত গলে যাতে কোনো পশু আসতে না পারে, সে জন্য কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
গরু কিনতেই লাগে ৭০ হাজার টাকা। এরপর কয়েক মাস পালন করতে গিয়ে আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন বাজারে ভালো দাম না পেলে ছোট ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে পারবে না।
শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ১৬ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ১৩ হাজার ১০০টি। বিপরীতে উপজেলায় চাহিদা রয়েছে ১২ হাজার ৭২৬টি পশুর। ফলে এলাকায় পশুর কোনো সংকট নেই। উপজেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট এক হাজার ১১৩টি খামার রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত বড় খামারের সংখ্যা ১৫টি।
সাতমাইল পশুর হাট পরিচালনা কমিটির পক্ষে সোহেল আল মামুন বলেন, হাটে পর্যাপ্ত পশু উঠছে। ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। সামনে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তপু কুমার সাহা জানান, এ উপজেলায় হাটে আসা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভ পরীক্ষা ও অসুস্থ পশুর চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিষিদ্ধ উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা পশু বাজারজাত ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, যশোরের আট উপজেলায় মোট ১৯টি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদরে ছয়টি, মণিরামপুরে তিনটি, বাঘারপাড়ায় চারটি, অভয়নগরে দুটি এবং কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় একটি করে পশুর হাট রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর যশোরে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। জেলার চাহিদা এক লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। ফলে প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। বর্তমানে জেলায় খামারির সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০ জন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান বলেন, যশোরের পশু স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে যশোরের পশুর চাহিদা বেশি। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।