শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
বর্ষা মৌসুম আগমনের আগ দিয়ে যশোরে আবারও ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা শুরু হলেই দ্রুত বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি। বিশেষ করে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগের চার বছরে জেলায় আট হাজার ৫৭৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত সাত বছরে যশোরে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ৫৩২। সংক্রমণের উচ্চমাত্রার কারণে একাধিকবার যশোর সদর ও অভয়নগর উপজেলাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, যশোরে চলতি বছরে প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে ৮৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যা গত কয়েক বছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় দ্বিগুণ। স্বাস্থ্য বিভাগের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী গত বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত জেলায় ৪৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপর শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত হন ৪৭ জন। এরপর বর্ষার প্রভাবে জুলাইয়ে ১৬৪ জন, আগস্টে ১৭৮ জন, সেপ্টেম্বরে ২০৯ জন, অক্টোবরে ৩৩২ জন এবং নভেম্বরে ৩২২ জন আক্রান্ত হন। ডিসেম্বর মাসে পানি কমে গেলে আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২-তে। অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর মাসে এক হাজার ২০৫ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই পরিসংখ্যান বলে দেয়, বর্ষা মৌসুম ও পরবর্তী কয়েক মাসই ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এখনই। কারণ বর্ষার শুরুতে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার লার্ভা দ্রুত জন্ম নেয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ বিস্তারলাভ করে। তাই মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কারণ ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত জুন থেকে বাড়তে শুরু করে, জুলাই ও আগস্টে সংক্রমণ বিস্তার লাভ করে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর নভেম্বর থেকে ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকে।
গত সাত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়কালে যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ৫৩২। এদের মধ্যে ২৬ জন মারা যান। এর মধ্যে ২০১৯ সালে তিন হাজার ৭৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন। ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ৬৮ জনে নেমে এলেও ২০২১ সালে ছিল ১৪৫ জন। ২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৮৮৮ জন। ২০২৩ সালে জেলায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় চার হাজার ৯৮৩-তে, যা জেলার ইতিহাসে সর্বাধিক। ওই বছর ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ১৯ জন। ২০২৪ সালে জেলায় আক্রান্ত হন এক হাজার ৩৪২ জন এবং মৃত্যু হয় ছয়জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৬০। ওই বছর ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সাবেক আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সঙ্গে আবহাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টিপাত ও বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে এডিস মশার বংশবিস্তারও দ্রুত হয়। বিশেষ করে থেমে থেমে বৃষ্টি হলে বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, যা মশার লার্ভা জন্মানোর আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বর্তমানে যে আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন শুধু অতিবৃষ্টি হলেই ডেঙ্গু বাড়ে। বাস্তবে মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ সময় ধরে আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার জন্য বেশি অনুকূল। কারণ এতে পানি দীর্ঘ সময় স্থির থাকে এবং মশার প্রজনন সহজ হয়। তাই বর্ষাকালে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি।
এদিকে ইতোমধ্যে অভয়নগর উপজেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। সোমবার (৮ জুন) পর্যন্ত দুইজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রোগী শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব বলেন, ‘অভয়নগর অতীতে ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তাই আমরা শুরু থেকেই সতর্ক রয়েছি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখার কাজ চলমান রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও যাতে দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়, সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভয়নগর উপজেলার একটি বড় অংশ বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। এছাড়া মোংলা-বেনাপোল করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং শিল্প ও নৌবন্দর এলাকা হওয়ায় এখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত ঘটে। এসব কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং আক্রান্তদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করে যাচ্ছি।’
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু এবং অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করা হবে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, ‘চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগী শনাক্তকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। স্বাস্থ্য প্রশাসনের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, সামাজিক নেতৃত্ব ও সচেতন নাগিরকরা মিলে যদি এক সঙ্গে কাজ করি, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা অব্যবহৃত পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু রোগে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু টানা জ্বর, শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি, পেট ব্যথা বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দেরি হলে জটিলতা বাড়তে পারে।