রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
মাঠে বল গড়াতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু তার আগেই জেলাজুড়ে শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপের মহোৎসব। চায়ের দোকান, অফিস কিংবা তরুণদের আড্ডা সবখানেই এখন আলোচনা কেন্দ্রবিন্দু ফুটবল।
প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা জানাতে জার্সি ও পতাকার পাশাপাশি টেলিভিশন কেনার ধুম পড়েছে। আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে কথার লড়াই ও শোডাউন।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সরগরম টেলিভিশনের বাজার। দর্শকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন অফার দিচ্ছে শোরুমগুলো। সব মিলিয়ে খেলা শুরুর আগেই বিশ্বকাপের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে যশোর।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে সমগ্র যশোরে বিভিন্ন ফুটবল দলের সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়েছে উন্মাদনা। বিভিন্ন বাসাবাড়ির ছাদে, রাস্তার পাশে টানানো হয়েছে প্রিয় দলের পতাকা। কার চেয়ে কে বড় পতাকা টানাবে, এই প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। শহর কিংবা গ্রামের দোকানগুলোতে চলছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দলের পতাকা বিক্রির ধুম। তবে, ফুটবল বিশ্বকাপ কিংবা বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এই দুই দলের চিরন্তন উন্মাদনা রূপ নেয় এক মহোৎসবে।
আজ ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর।
১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম উত্তর আমেরিকায় ফিরছে ফুটবল বিশ্বকাপ। এবারের আসরটি নানা কারণেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ট্রফির জন্য রেকর্ড সংখ্যক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা চার বছর আগে কাতারে অংশ নেওয়া ৩২টি দলের পরিবর্তে এবার ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। এর ফলে ম্যাচ সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১০৪-এ। যা প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে অনুষ্ঠিত হবে।
আজ মেক্সিকোসিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে ৩৯ দিনব্যাপী এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। আগামী ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে এই আসরের।
ফিফা বিশ্বকাপ একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা যেখানে ফিফাভুক্ত দেশগুলোর পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল অংশ নেয়। ১৯৩০ সালে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং এখন পর্যন্ত চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে এই প্রতিযোগিতা হয়নি।
এই বিশ্বকাপে নতুন ফরম্যাটে চার দলের ১২টি গ্রুপ থাকবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং আটটি সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্যায়ে উঠবে। সেরা তৃতীয় স্থান নির্ধারণে পয়েন্ট, গোল পার্থক্য এবং মোট গোল- এই তিনটি বিষয় প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।
এবারের বিশ্বকাপের আসর ৩৯ দিন ধরে চলবে, যা কাতারের ২৯ দিন এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের আসরের ৩২ দিনের চেয়েও বেশি।
উদ্বোধনী দিন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ১৭ দিনে মোট ৭২টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর অনুষ্ঠিত হবে ৩২ দলের পর্ব (২৮ জুন-৩ জুলাই), তারপরে ১৬ দলের পর্ব (৪-৭ জুলাই), কোয়ার্টার-ফাইনাল (৯-১১ জুলাই), সেমি-ফাইনাল (১৪-১৫ জুলাই) এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ (১৮ জুলাই)।
আগামী ১৯ জুলাই, রবিবার নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের হাতে তুলে দেওয়া হবে কাপ। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশের ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি, মেক্সিকোতে তিনটি এবং কানাডায় দুটি। যেহেতু ফিফা স্টেডিয়ামের জন্য আগে থেকে বিদ্যমান বাণিজ্যিক নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ভেন্যুগুলোর নামকরণ আয়োজক শহরের নামে হবে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে, যেটি বিশ্বকাপের তিন সংস্করণ আয়োজনকারী প্রথম ভেন্যু হিসেবে ইতিহাস গড়বে। এর পাশাপাশি ম্যাচ হবে গুয়াদালাহারা এবং মন্টেরেতেও। কানাডায় দুটি স্থানে খেলা হবে- টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভারে।
বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, নিউইয়র্ক বা নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সানফ্রান্সিসকো বা সান্তা ক্লারা এবং সিয়াটলে খেলা হবে।
যেহেতু ম্যাচগুলো চারটি ভিন্ন টাইম জোন এবং সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে অবস্থিত ভেন্যুগুলোতে হবে, তাই মোট ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ম্যাচ শুরু হবে। আমেরিকাই হবে সেই মহাদেশ, যারা সবচেয়ে সহজে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবে, কারণ সব ম্যাচ নিজ নিজ ভেন্যুতে দুপুর একটার আনুষ্ঠানিক বাঁশি বাজার পর থেকে মধ্যরাতের খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত হবে।
কিন্তু আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং ব্রাজিলের বেশিরভাগ অংশের ক্ষেত্রে যদি তারা দিনের শেষ ম্যাচগুলো দেখতে চায়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ভোর চারটার পরেও জেগে থাকতে হবে। অন্যান্য মহাদেশের ক্ষেত্রে সময় ভিন্ন হবে।
ইউরোপে বেশিরভাগ ম্যাচ সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ায় এগুলো মূলত ভোরবেলা দেখানো হবে।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ খেলা দেখা যাবে ভোর চারটা থেকে সকাল ৭টায়, আবার কোনো কোনো ম্যাচ রাত ১০টা, রাত ১টায়ও শুরু হবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ নতুন কয়েকটি দেশের জন্য বিশেষ স্মরণীয় হতে যাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে জায়ারের পরিবর্তিত নাম নিয়ে কঙ্গো রিপাবলিক ছাড়াও প্রথমবারের মতো মূল পর্বে অংশ নিচ্ছে কুরাসাও, কেপ ভার্দে, উজবেকিস্তান এবং জর্ডান। শিরোপার দৌড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পাশাপাশি দারুণ ফর্মে থাকা স্পেন, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সকে অন্যতম দাবিদার ভাবা হচ্ছে। তবে, পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হিসেবের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। এছাড়া নরওয়ে, মরক্কো, জাপান ও কলম্বিয়ার মতো দলগুলো চমক দেখাতে পারে।
সবমিলিয়ে মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই যশোরের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ, যুক্তি-তর্ক আর প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ফুটবল জোয়ারে ভাসতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত যশোরবাসী।
বিশ্বকাপের রঙে রঙিন যশোর। শহরের জার্সি ও পতাকার দোকানগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় করছেন সমর্থকরা। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি ও পতাকা। এরপরেই রয়েছে ব্রাজিল।
আর্জেন্টিনা সমর্থক ফারজানা হাবীব রেমি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আর্জেন্টিনার খেলা দেখে আসছি। তাদের দলীয় স্পিড আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। এবার খেলাটি একটু ভিন্ন সময় হলেও পরিবার সহকারে উপভোগ করবো। গতবারও আর্জেন্টিনা কাপ নিয়েছে। এবারও ইনশাল্লাহ কাপ নেবে।’
মুজিবুর রহমান নামে আরেক সমর্থক বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে আমার পরিবারের জন্য ১৫টি জার্সি কিনতে এসেছি। এরমধ্যে আর্জেন্টিনার দশটি। পরিবারে অন্য সদস্যরা ব্রাজিলের সমর্থন করলেও, আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। পরিবারে দুই দল সমর্থন করলেও একসাথে বসে খেলা দেখি। ম্যারাডোনা থেকে মেসি পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রতিটি খেলা ভালো লেগেছে। এবার বিশ্বকাপের আসর বড় হওয়াই বিশ্বকাপটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
এদিকে, ব্রাজিলের সমর্থকরা বলছেন, নেইমারের জাদুতেই এবার শিরোপা যাবে ব্রাজিলের ঘরে। ব্রাজিলের সমর্থক প্রভাস কুমার মন্ডল বলেন, ‘ব্রাজিলের ভক্ত হয়েছি নেইমারের কারণে। তার খেলাটা দুর্দান্ত। কিন্তু এবার বিশ্বকাপে এই দলে আরো কিছু নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে। আরো ভালো খেলা দেখতে পারবো এই দলের। আশা করছি, ব্রাজিলের ঘরে এবার বিশ্বকাপ যাবে।’
সমর্থক শম্পা বর্মন বলেন, ‘কাকার খেলা দেখে আমি ব্রাজিলের সমর্থক হয়েছি। ছেলে নেইমারের খেলা দেখে ব্রাজিলের ভক্ত হয়েছে। বাপের বাড়ির সবাই ব্রাজিল আর শ্বশুরবাড়ির সবাই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে। সেজন্য ছেলের জন্য ব্রাজিলের জার্সি কিনতে এসেছি।’
ক্রীড়া সামগ্রীর দোকান ‘খেলাধুলা’র মালিক গোলাম সরোয়ার মামুন বলেন, ‘সকাল থেকে রাতঅবধি জার্সি বেচাকেনা হচ্ছে। আর্জেন্টিনার জার্সিটা বেশি বিক্রি হচ্ছে। তারপরে ব্রাজিলের। যেহেতু আমি ব্রাজিলের সাপোর্টার, তাই আগেভাগে কিছু জার্সি আলাদা করে রেখেছি।’
শুধু জার্সি-পতাকার বাজারই নয়, জমে উঠেছে টেলিভিশনের বাজারও। বিশ্বকাপের বড় পর্দার রোমাঞ্চ ঘরে তুলতে দর্শকরা ছুটছেন ইলেকট্রনিক্স শো-রুমগুলোতে। ফলে, জমে উঠেছে টেলিভিশনের বাজার। ক্রেতা আকর্ষণে শো-রুমগুলো দিচ্ছে আকর্ষণীয় অফার।
শহরের গাড়িখানা রোডে ওয়ালটন প্লাজার ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে টেলিভিশন কেনার একটা আমেজ ও উৎসব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খেলা যতো এগিয়ে আসছে, টেলিভিশন বিক্রিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে প্রতিদিন এক থেকে দুটি টেলিভিশন বিক্রি হতো, এখন প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি। খেলার ভেতর আরো বিক্রয় বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছি।’
টেলিভিশন কিনতে আসা নোমান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘চার বছর পরে বিশ্বকাপ হচ্ছে। এই খেলা বড় পর্দা দেখার জন্য অ্যান্ড্রয়েড টিভি কিনেছি। যাতে পরিবারের সকলকে সাথে নিয়ে এই ফুটবল বিশ্বকাপ সবাই একসাথে উপভোগ করতে পারি।’