যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বিচার চেয়ে ইবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও ভাটা

এক বছরেও অধরা সাজিদের খুনিরা

নুসরাত জাহান লিরা

, ইবি

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুলাই,২০২৬, ১০:০১ এ এম
এক বছরেও অধরা সাজিদের খুনিরা

১৭ জুলাই। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইতিহাসে শোকের প্রতীক হয়ে থাকা একটি দিন। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর লাশ। প্রথমে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় পানিতে ডুবে নয়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

তবে এক বছর পরও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, খুনিদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। প্রশাসনের একের পর এক আশ্বাস, তদন্ত কমিটি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার ঘোষণা। এতো কিছুর পরও মামলাটি আজও অমীমাংসিত।

সাজিদ হত্যার পর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মরণসভা করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোও সংহতি জানিয়ে আন্দোলন সক্রিয় করে তোলে। তাদের একটাই দাবি ছিল দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা।

এদিকে, ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সাজিদের বিভাগ আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর জোর আন্দোলন শুরু করলেও কয়েকদিন পর তা গতি হারায়। একপর্যায়ে তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

সাজিদ হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম পুষ্প বলেন, ‘গত বছর আজকের এই দিনে আমাদের বন্ধু সাজিদ আব্দুল্লাহকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। বিগত প্রশাসনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের গাফিলতি ও টালবাহানার অভিযোগ ওঠে। এসব অনিয়মে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই পরিণতিতে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আরও একটি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান উপাচার্য মহোদয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কেউ নন। তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’

এদিকে, গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাজিদ হত্যা মামলার তদন্তকাজে প্রয়োজনবোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয় সিআইডিকে। তারা বিভিন্ন সময় সাজিদের বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকসহ অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও এখনো কোনো ক্লু বের করতে পারেননি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপের মুখে কিছুদিন পরপর ইবির প্রক্টর অফিসে সিআইডি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলেও প্রায় একই ধরনের আশাবাদ একাধিকবার ব্যক্ত করায় তা শিক্ষার্থীদের মাঝে আবেদন হারায়। পরে বন্ধ হয়ে যায় সেই আপডেট ব্রিফিংও।

এদিকে, সাজিদের খুনিদের খুঁজে বের করতে ইবি থানা ও সিআইডি দৃশ্যত ব্যর্থ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার প্রশাসন গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, সাজিদ হত্যার পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজিদের ব্যবহৃত শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নম্বর কক্ষে বেডটি তদন্তের স্বার্থে উলটপালট করে ওই অবস্থায় কক্ষটি সিলগালা করে রাখা হলেও দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্টরা গিয়ে সাজিদের রুমটি পরিপাটি অবস্থায় দেখতে পান।

প্রশাসনের অগোচরে রুমে তৃতীয় কারো প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ হলে ওই রুমের সিলগালা করা তালার চাবির খোঁজ করা হয়। ওই সময় জানা যায়, লাশ উত্তোলনের পর সাজিদ আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত রুমটি তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করার জন্য যে তালাটি রুমে লাগানো হয়েছিল সেটি হল মসজিদের। ওই তালার তিনটি চাবি, যার একটি হলের একজন কর্মচারীর কাছে, একটি হল মসজিদের ইমামের কাছে এবং অপরটি সাদ্দাম হোসেন হলে অবস্থানরত একজন ছাত্রের কাছে রয়েছে। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ ঘটনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল হত্যাকাণ্ডের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ। এক বছর পরও সেদিনের বিকাল পাঁচটা থেকে রাত ১১টার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ফুটেজ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোথাও বলা হয়েছে ফুটেজ নেই, কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও আংশিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি তৎকালীন প্রশাসন সিসিটিভি প্রসঙ্গে আইসিটি সেলকে ব্যাখ্যা দিতে বললেও শেষ পর্যন্ত সেই রহস্যেরও কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।

অন্যদিকে, তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নামেন। ১০০ দিন পার হওয়ার পরও তারা বিচার দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। পরে দশ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পরিবারের আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়।

তবে এসব বিষয়ে সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার বলেন, ‘এক বছর হতে চলেছে আমার ছেলের বিচার এখনো হলো না। তাহলে কি বিচার হবে না? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছুই এখনো জানাতে পারে না! আমি নিজেই মাঝে মধ্যে ফোন দিই, কিন্তু তারা কোনো খোঁজ নেয় না। মাঝে মধ্যে শুধু ছাত্র সংগঠনের কেউ কেউ খোঁজ নেয়। আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল, তা-ও দেওয়া হয়নি।’

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে বর্তমানে মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইনসপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, ‘আমি এই মামলার দায়িত্ব পেয়েছি এক মাস আগে। মামলার তদন্ত চলমান। তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় কোনো তথ্য জানানো সম্ভব না। তবে আমরা সাক্ষ্য নিচ্ছি, জিজ্ঞাসাবাদ করছি, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অ্যানালাইসিস করছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কতদিন সময় লাগতে পারে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে কোনো ধরনের ক্লু পেলে আমরা দ্রুত সমাধান করতে পারবো।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)