যশোরে পারমাণবিক নিরাপত্তা বিধিমালা উপেক্ষিত
সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোরের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ মানছেন না বাংলাদেশ পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা নির্দেশনা। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যত্রতত্র ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যান কার্যক্রম চলছে।
এসব যন্ত্র ব্যবহারের ফলে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ, রোগীর স্বজন এবং স্বয়ং স্বাস্থ্যকর্মীরা মারাত্মক রেডিয়েশন (বিকিরণ) ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, অসচেতনতার কারণে বন্ধ্যাত্ব, ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিকিরণ সুরক্ষায় পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এক্স-রে কক্ষের দেয়াল ন্যূনতম দশ ইঞ্চি পুরু হতে হবে। কক্ষের দরজায় এক্স-রে রশ্মি প্রতিরোধী লোহা বা সিসার (লেড) পাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যশোরের বেশিরভাগ বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেনতেনভাবে কক্ষ তৈরি করে এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের এক্স-রে কক্ষের দরজায় সাধারণ গ্লাস লাগানো, এমনকি কোথাও কোথাও কেবল কাপড়ের পর্দা ঝুলিয়ে এক্স-রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফলে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ক্ষতিকর রঞ্জনরশ্মি কক্ষের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, শহরের মডার্ন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নোভা মেডিকেল সেন্টার হসপিটাল, প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবজোন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কমটেক ডায়াগনস্টিক, মেডিকিউর ডায়াগনস্টিক, আল্ট্রাভিশন ডায়াগনস্টিকসহ বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্স-রে কক্ষ নির্মাণে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মানা হয়নি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কক্ষে ছাদের পরিবর্তে টিনের ছাউনি, কাচের দরজা ও পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল দেওয়া হয়েছে; যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।
যশোর মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম মহফুজ রাব্বানী জানান, এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান থেকে আয়নাইজিং রেডিয়েশন নির্গত হয়। অতিরিক্ত বা বারবার এই বিকিরণ বা রেডিয়েশন শরীরে প্রবেশ করার কারণে হৃদরোগসহ কোষের ডিএনএ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও পরে রেডিয়েশন সিকনেস (বমি ভাব, চুল পড়া, ক্লান্তি) দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের বন্ধ্যাত্ব তৈরি করতে পারে, এমনকী ব্লাড ক্যানসারসহ (লিউকেমিয়া) নানা ধরনের ক্যানসার হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এই বিকিরণ চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।
যশোর মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার আবু সাঈদ জানান, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ (পানিবিনি) আইন-১৯৯৩ এবং পানিবিনি বিধিমালা-১৯৯৭-এর বিধি-৯৫ অনুযায়ী, লাইসেন্স ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠানে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, ম্যামোগ্রাফি, ফ্লোরোস্কপি, এনজিওগ্রাম কিংবা ডেন্টাল এক্স-রে মেশিন পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। কর্মী, জনসাধারণ ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই আইন করা হয়েছে। কিন্তু বিধি মানার প্রবণতা কম।
যশোর জেনারেল হাসপতালের এক্স-রে বিভোগের ইনর্চাজ মৃত্যুঞ্জয় রায় বলেন, নিয়ম অনুযায়ী, এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান কক্ষে কর্মরত টেকনোলজিস্টদের সুরক্ষামূলক বিশেষ পোশাক (লেড অ্যাপ্রন) এবং শরীরে বিকিরণের মাত্রা পরিমাপক ‘টিএলডি ব্যাজ’ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। তবে যশোরের অধিকাংশ সেন্টারের কর্মীদের কোনো সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করতে দেখা যায় না। আরও ভয়াবহ চিত্র হলো, পরীক্ষা চলাকালে রোগীর সাথে আসা স্বজনদেরও হরহামেশা এক্স-রে কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সুস্থ মানুষও সরাসরি আয়নাইজিং রেডিয়েশনের শিকার হতে পারেন। এই রেডিয়েশন নানাভাবে ক্ষতি করে। চোখে দেখা না গেলেও এক্স-রে কক্ষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রেডিয়েশন মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বাস্থ্য বিভগের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি বা আইনের প্রয়োগ নেই। লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে জেলার অনেক প্রতিষ্ঠান চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, বাংলাদেশ পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অনুমোদন না নিয়ে যশোরের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিজেদের ইচ্ছামতো এক্স-রে বিভাগ খোলার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। নিয়ম না মেনে এক্স-রে কক্ষ চালু করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত ওই সব প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা হবে।