যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

সোনা উদ্ধার হয়, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন মূল হোতারা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
সোনা উদ্ধার হয়, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন মূল হোতারা

বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে সোনা চোরাচালান নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার হচ্ছে। কখনো সোনার বার, কখনো গলিত সোনা, আবার কখনো বিভিন্ন কৌশলে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণালংকার। এসব সোনা অবৈধ পথে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আনা হয়, আবার বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে পাচার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাহিনীর হাতে মাঝেমধ্যে বাহকরা ধরা পড়লেও এই চোরাচালানের মূল নিয়ন্ত্রক ও অর্থলগ্নিকারীরা কেন অধরাই থেকে যাচ্ছেন?

সর্বশেষ মেহেরপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে প্রায় সাত কোটি ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩২টি সোনার বার উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। গত রোববার (১ নভেম্বর) মুজিবনগর উপজেলার নাজিরাকোনা সীমান্তের নাগারবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন কেজি ৯৪১ গ্রাম ওজনের এসব সোনার বার উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি)। এ সময় সোনা পাচারের অভিযোগে আটক হন মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর নতুনপাড়া গ্রামের দুই ব্যক্তি। বিজিবির তৎপরতায় বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই অভিযানের সাফল্য কেবল সোনা উদ্ধার ও বাহক আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চোরাচালানের প্রকৃত চক্রটি অক্ষত থেকে যাবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোটি কোটি টাকার সোনা একজন বা দুজন সাধারণ বাহকের নিজস্ব সম্পদ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এর পেছনে থাকে বিদেশ থেকে সোনা সংগ্রহকারী, অর্থের জোগানদাতা, পরিবহনকারী, সীমান্তপথের সমন্বয়কারী এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতার একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। বাহকরা সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ঝুঁকি নিয়ে সোনা বহন করেন। ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, কারাগারে যেতে হয়; কিন্তু যারা এই ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন, পরিকল্পনা করেন এবং পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, তাদের পরিচয় অনেক সময়ই সামনে আসে না। ফলে একই পথে নতুন বাহক নিয়োগ করে চোরাচালান অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।

এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বাহকদের আটক করার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ কতটা নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ মূল চোরাচালানিদের পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়। কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে যোগসাজশ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে বিজিবির আইনি এখতিয়ার ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সীমান্তে অভিযান চালিয়ে অপরাধী আটক করা বিজিবির দায়িত্বের অংশ হলেও দেশের অভ্যন্তরে বিস্তৃত তদন্ত ও অভিযান পরিচালনায় তাদের ক্ষমতার সীমা রয়েছে। তাই এ ধরনের অপরাধ দমনে বিজিবি, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক গোয়েন্দা এবং আর্থিক অপরাধ তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে চোরাচালানের অর্থ কোথা থেকে আসছে, কার মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে এবং পাচার করা সোনা শেষ পর্যন্ত কার হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা অনুসন্ধান করতে হবে।

সোনা চোরাচালান শুধু শুল্ক ফাঁকি বা সীমান্ত অপরাধ নয়; এর সঙ্গে অর্থ পাচার, অবৈধ পুঁজি স্থানান্তর, দুর্নীতি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ কারণে শুধু পণ্য উদ্ধার করে মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন অর্থের উৎস অনুসন্ধান, সম্পদ শনাক্তকরণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের তদন্ত এবং দেশি-বিদেশি অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা।

মেহেরপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযান সফল হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন আটক দুই বাহকের পাশাপাশি এই বিপুল পরিমাণ সোনার প্রকৃত মালিক ও পাচারচক্রের নিয়ন্ত্রকদেরও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, বাহকরা চোরাচালানের দৃশ্যমান অংশমাত্র; নেপথ্যের হোতারাই এই অবৈধ ব্যবসার চালিকাশক্তি। তাই বাহক গ্রেপ্তারের পর মূল মালিকের অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় সোনা উদ্ধার হবে, বাহক ধরা পড়বে, মামলা হবে; কিন্তু চোরাচালানের সাম্রাজ্য অটুটই থেকে যাবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)