যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্বাধীনতার আসল মানে মর্যাদার আলোয় নারী

মারুফা আক্তার

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
স্বাধীনতার আসল মানে মর্যাদার আলোয় নারী

নারীর স্বাধীনতা নিয়ে আজকাল অনেক কথা হয়। কেউ একে সমাজের অগ্রগতির চাবিকাঠি মনে করেন, কেউ আবার সন্দেহের চোখে দেখেন। অথচ প্রশ্নটা আসলে খুব সরল—নারী কি একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান ও সুযোগ পাচ্ছেন? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ।

আমার বিশ্বাস, নারীর স্বাধীনতা মানে নিজের যোগ্যতায় দাঁড়ানোর অধিকার। পড়াশোনা করা, কাজ করা, উপার্জন করা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এই স্বাধীনতার মেরুদণ্ড। যে নারী নিজের আয়ে চলেন, তাকে অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় না। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন, সন্তানকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে পারেন, পরিবার ও সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই সক্ষমতাই একজন নারীকে সত্যিকারের মুক্তি দেয়।

এই স্বাধীনতার সঙ্গে মার্জিত জীবনযাপনের কোনো বিরোধ নেই। একজন নারী শালীনতা, রুচি ও ভদ্রতা বজায় রেখেও চিকিৎসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক কিংবা কৃষক হতে পারেন। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য নারী আছেন, যারা নীরবে পরিশ্রম করে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন। গ্রামের যে নারী হাঁস-মুরগি পালন করে সন্তানের স্কুলের খরচ জোগান, শহরের যে নারী অফিস সামলে সংসারের দায়িত্বও পালন করেন, তাদের আত্মবিশ্বাসই প্রমাণ করে, মর্যাদাপূর্ণ জীবন আর স্বাধীনতা পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।

দুঃখজনক হলো, একটি পক্ষ ‘নারী স্বাধীনতা’র সুন্দর শব্দযুগলকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। কেউ এর আড়ালে বেপরোয়া আচরণ ও উচ্ছৃঙ্খলতাকে বৈধতা দিতে চান। কেউ আবার নারীকে পণ্য বা ভোগের উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করে মুনাফা কামান, আর নাম দেন ‘স্বাধীনতা’। এটা স্বাধীনতা নয়, বরং নারীকে নতুন মোড়কে ব্যবহার করা। বর্বরতা কখনো স্বাধীনতার ভাষা হতে পারে না। যে স্বাধীনতা নারীর মর্যাদা বাড়ায় না, তাকে আত্মনির্ভর করে না, শুধু কারও স্বার্থ পূরণ করে, তাকে স্বাধীনতা বলা যায় না। এই খাঁটি আর মেকির পার্থক্য চিনতে শেখা আজ সময়ের দাবি।

এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের একাংশ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো জরুরি। অনেকে এখনো মনে করেন, নারী সুযোগ পেয়েছেন মেধা বা যোগ্যতার জোরে নয়, বরং ‘বাড়তি সুবিধা’ বা শিথিলতার কারণে। এই ধারণা ভুল ও অন্যায্য। পরীক্ষার ফলাফল, কর্মক্ষেত্রের সাফল্য, গবেষণা, প্রশাসন, খেলাধুলা, সবখানেই নারী বারবার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের নারীরা পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে সচিবালয়, আদালত থেকে মহাকাশ-স্বপ্ন পর্যন্ত নিজের জায়গা করে নিয়েছেন কোনো করুণায় নয়, নিজের শ্রম ও মেধায়। এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই সুস্থ মানসিকতার পরিচয়। পুরোনো ভুল ধারণা ভেঙে নারীকে সম্মান করতে শেখা এখন আমাদের সবার দায়িত্ব।

নারীকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার কোনো কারণ নেই, ছোট করে দেখারও না। তাকে দেখতে হবে সহযাত্রী ও সহযোদ্ধা হিসেবে। সমাজ এগোয় তখনই, যখন নারী ও পুরুষ পরস্পরের হাত ধরে হাঁটেন। একজনের সাফল্য আরেকজনের পরাজয় নয়। সম্মান দিলে তা ফিরে আসে, আর সুযোগ দিলে পুরো সমাজই সমৃদ্ধ হয়। যে পরিবারে মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যা মর্যাদা পান, সেই পরিবারই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী।

আমাদের মনীষীরাও এ কথাই বলে গেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:

‘বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

বেগম রোকেয়া তার ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পা বেঁধে রাখলে কেউ কি চলতে পারে? নারীকে পিছিয়ে রেখে সমাজ এগোতে পারে না, এই চিরন্তন সত্য তিনি শতবর্ষ আগেই বলে গেছেন। কালের ব্যবধান থাকলেও এই মনীষীদের উপলব্ধি এক জায়গায় এসে মেলে—নারীর মুক্তি মানে মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ বিকাশ।
তাই নারীর স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের ভাবনা হোক পরিষ্কার ও দৃঢ়। নারী একজন মানুষ, তার আছে মেধা, শ্রম ও আত্মমর্যাদা। তাকে শিক্ষা দিন, সুযোগ দিন, বিশ্বাস করুন, সম্মান করুন। যারা স্বাধীনতার নামে স্বার্থ হাসিল করতে চান, তাদের মুখোশ চিনে রাখুন, আর যারা সত্যিকারের স্বাধীনতার পথে সততা ও মর্যাদার সঙ্গে হাঁটছেন, তাদের পাশে দাঁড়ান।

একটি সুন্দর, ন্যায্য ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে হলে নারী ও পুরুষ, দু’জনকেই হাতে হাত রেখে এগোতে হবে। সেই পথের সবচেয়ে বড় পাথেয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস।

লেখক: সমাজ উন্নয়ন কর্মী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)