পার্থিব আহসান
বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সৌরবিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জমির সংকট ও নীতিগত জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা না গেলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। বর্তমান সরকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ শুধু গ্রাহক থাকবে না, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হবে।’
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতটা অগ্রগতি সম্ভব হবে, তা নিয়ে এখন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা বিবেচনায় আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, জলবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রুফটপ থেকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক প্রাপ্ত বিভিন্ন দরপত্রের মূল্য বিবেচনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ আট টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে এই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য সাড়ে দশ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনও গ্রাহক নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে সক্ষম হলে সাশ্রয়কৃত অর্থ তার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সাড়ে দশ টাকা হারে মূল্য পাবেন। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর স্থাপিত সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।
সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্প
৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প রামপালে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুকেন্দ্রের পাশের ব্লক ‘বি’তে ৬৮৫ একর জমিতে এই কেন্দ্রটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পিডিবি। দুই হাজার ১২৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল এবং ৩৭৫ কোটি টাকা পিডিবি তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আনতে চায় তারা। পাশাপাশি মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পন্ডের জায়গায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। এতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। তবে কবে নাগাদ এটি উৎপাদনে আসবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সংসদ ভবনে সৌরবিদ্যুৎ
এমনকি জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনো বিদ্যুৎ না নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায় সরকার। এ বিষয়ে সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আগামী দিনে এই জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনো বিদ্যুৎ গ্রহণ করবো না। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চাই।’
নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অপরদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকার নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। এজন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এতে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে এগিয়ে আসতে পারবেন।’
বড় বাধা জমি
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বিনিয়োগকারীদের নিজেদের জমি কিনতে হলে প্রকল্পের বিনিয়োগ ও বিদ্যুতের দাম দুটোই বাড়বে। তাই সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্পের জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে সরকার জমি দেবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর তাদের পতিত জমির তালিকা জমা দিয়েছে। সব মন্ত্রণালয় মিলে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে একটি টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে বর্তমান সরকারের সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী। তবে স্রেফ নীতি বা প্রজ্ঞাপন জারি করলেই এই লক্ষ্য পূরণ হবে না। এর সফল বাস্তবায়নের পথে থাকা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী বাধা কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। সরকার যদি প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে এবং মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা বজায় রেখে এগোতে পারে, তবেই বাংলাদেশ আগামী দিনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।
লেখক: যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী