শাহারুল ইসলাম ফারদিন
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার যশোর। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের কথা তুলে ধরার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সুবর্ণভূমি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল প্রকাশনার প্রথম বছর। এই এক বছরে পাঠকের ভালোবাসা, আস্থা ও অংশগ্রহণকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদপত্রটি নিজের জায়গা তৈরি করেছে।
তবে সুবর্ণভূমির এই এক বছর শুধু একটি নতুন সংবাদপত্রের পথচলার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সংবাদমাধ্যমের বেদনা, প্রতিকূল সময় পেরিয়ে আবার ফিরে আসার প্রত্যয় এবং সংবাদ প্রকাশের অধিকারকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে ফিরে আসা
সুবর্ণভূমির যাত্রা অবশ্য আজকের নয়। প্রায় এক যুগ আগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একদল সংবাদকর্মীর উদ্যোগে নিউজপোর্টাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। অল্প সময়ের মধ্যেই যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঠকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে সুবর্ণভূমি। স্থানীয় সংবাদ, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ, জনদুর্ভোগ ও মানুষের অধিকার নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতো পোর্টালটি।
২০২১ সালের ১২ অক্টোবর ‘ঝিনাইদহে স্কুলে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বন্ধ হয়ে যায় সুবর্ণভূমির নিউজপোর্টাল। পরবর্তী সময়ে রেজিস্ট্রেশন না থাকার কারণ দেখিয়ে পোর্টালটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানানো হয়। অথচ নিউজপোর্টাল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর সুবর্ণভূমি কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিয়মে নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। সেই আবেদন গ্রহণ না করার কারণও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কখনও জানানো হয়নি।
কয়েক বছর বন্ধ থাকার সেই সময়টি ছিল সুবর্ণভূমির জন্য কঠিন এক অধ্যায়। পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল একটি সংবাদমাধ্যম। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের প্রত্যয় থেমে থাকেনি।
নতুন সময়, নতুন যাত্রা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুবর্ণভূমির উদ্যোক্তারা আবারও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। একই নামে দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন লাভের পর শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
২০২৫ সালের শেষভাগে প্রথমে বাজারে আসে দৈনিক সুবর্ণভূমির ছাপা সংস্করণ। দীর্ঘ বিরতির পর যশোরের পাঠকের হাতে ফিরে আসে পরিচিত নামটি। এরপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে ৮ নভেম্বর ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে আবার চালু হয় সুবর্ণভূমির অনলাইন নিউজপোর্টাল www.subornouvmi.com। একই সঙ্গে চালু হয় ই-পেপার esubornouvmi.com।
একটি বন্ধ সংবাদমাধ্যমের পুনরায় ফিরে আসা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পাঠকের প্রত্যাশা, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার দায়িত্ব।
বদলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের দুনিয়া
সুবর্ণভূমির নতুন যাত্রার সময়টিও আলাদা। গত কয়েক বছরে সংবাদমাধ্যমের চরিত্র দ্রুত বদলে গেছে। ছাপা কাগজের পাশাপাশি অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তথ্য পাওয়া এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে ভুল তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। একটি খবর মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে দ্রুততার সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা রক্ষা এখন আরও বড় দায়িত্ব।
সুবর্ণভূমি বিশ্বাস করে, প্রযুক্তি বদলাবে, সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম বদলাবে, পাঠকের অভ্যাসও বদলাবে। কিন্তু সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটি বদলানো উচিত নয়।
ডিজিটাল প্রতিযোগিতার এই সময়ে দ্রুত সংবাদ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু আগে প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। একটি তথ্য কতটা যাচাই করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, সংবাদটি পাঠকের কাছে কতটা নির্ভুলভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুবর্ণভূমির সম্পাদকীয় অবস্থান শুরু থেকেই ছিল নির্মোহ সংবাদ পরিবেশন। সেই নীতিকে সামনে রেখেই ছাপা কাগজের পাশাপাশি অনলাইন ও ই-পেপারে পাঠকের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খবরের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা সংবাদে তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি, জনদুর্ভোগ ও নাগরিক সমস্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় অর্জন
একটি সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার পাঠক। পাঠকের আস্থা অর্জন করা যেমন কঠিন, সেই আস্থা ধরে রাখা আরও কঠিন। সুবর্ণভূমির প্রথম বছরের পথচলায় সবচেয়ে বড় অর্জন পাঠকের সঙ্গে এই সম্পর্ক তৈরি হওয়া।
ভুল-ত্রুটি যে হয়নি, তা নয়। সাংবাদিকতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রতিবেদন থেকে শেখার সুযোগ আছে, নিজেদের আরও পরিশীলিত করার সুযোগ আছে। সেই জায়গা থেকেই সামনে এগিয়ে যেতে চায় সুবর্ণভূমি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মুহূর্তে তাই পেছনের এক বছরের হিসাবের পাশাপাশি সামনে থাকা পথের কথাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত সততা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং মানুষের কথা বলার দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে আরও অনেক দূর।
এক বছর একটি সংবাদপত্রের জন্য হয়তো খুব দীর্ঘ সময় নয়। কিন্তু একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের নতুন করে ফিরে এসে এক বছর পার করা নিঃসন্দেহে আলাদা একটি অধ্যায়। এই পথচলায় যেমন আছে অতীতের অভিজ্ঞতা, তেমনি আছে ভবিষ্যতের বড় দায়িত্ব।
সুবর্ণভূমির সামনে এখন লক্ষ্য আরও শক্তিশালী সাংবাদিকতা, আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও ইতিবাচক ব্যবহার এবং পাঠকের কাছে দ্রুত, নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনের সময়েও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি থেকে সরে না যাওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সুবর্ণভূমির স্টাফ রিপোর্টার