মাহমুদা রিনি
চোখ বন্ধ করে থাকলেই যেমন বিপদ এড়ানো যায় না। আবার বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়েও সুসময় এগিয়ে আনা সম্ভব নয় যদি সঠিক সময়ে সচেতন না হওয়া যায়। আমরা যারা অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি তাদের চোখে সময়ের পরিবর্তন বড়ো বেশি চাক্ষুষ। বাংলাদেশের জন্ম, তার আগের পরিবেশ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছরের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের যে ধারাবাহিকতা তা আমাদের চক্ষে শান্তি নাহোক মোটামুটি স্বস্তিদায়ক ছিল কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কথায় আছে শান্তির চেয়ে স্বস্তি প্রয়োজন। সেই স্বস্তিও যেন আমাদের কাছে সুদূর পরাহত, কল্পরাজ্যের সোনার হরিণ। এদেশের আকাশ থেকে কালোমেঘের রাহুগ্রাস যেন কাটতেই চায় না।
পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু আদর্শিক মূল্যবোধহীন দিকভ্রান্ত বর্তমান প্রজন্মের যে পরিবর্তন সেটার উপর ভিত্তি করে একটি শিক্ষিত, সুগঠিত সমাজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া কতখানি যুক্তিসঙ্গত তা ভাবিয়ে তোলে! আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, অথচ স্বাধীনতার পর থেকে মানুষ গড়ার স্কুলিং সিস্টেমকে সঠিক পদ্ধতিতে কার্যকর করা যায়নি এই দায় কার? নিশ্চয় সমাজের খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণি বা অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের নয়! সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষের হাতেই থাকে পরিবর্তনের চাবিকাঠি। অথচ দেখা যায় পরিণতি ঠিক তার উল্টো। তারা নিজেদের স্বার্থে পরিবেশকে পরিবর্তন করে। সার্টিফিকেটের ওজন দেখে মানুষকে শিক্ষিত মানতে বাধ্য হতে হয় বটে কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধের সামান্য রেশটুকু ধরে রেখেছে সাধারণ মানুষেরাই। দেশপ্রেম, সততা, শালীনতাবোধ শিক্ষার থেকে শিশু কিশোরদের দূরে রাখতে একশ্রেণীকে বরাবরই তৎপর দেখা যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই শিশু- তরুণদের বিভিন্ন মতাদর্শে বিভক্ত করে এক এক গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে তারা দিকভ্রান্ত আচরণ করে। একটি প্রজন্মকে যদি দিকভ্রান্ত করা হয় সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে কয়েক প্রজন্ম পার হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। যার ফলে তৈরি হবে জন্মান্ধ তরুণ সমাজ। এই বিভ্রান্তির দায় তাদের নয় বরং এ দায় স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা সরকার ও শিক্ষিত সুশীল সমাজের এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সমাজের বৃহৎ সংখ্যক শিশুদের বিভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষার নামে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, কুসংস্কারের বলয়ে জড়িয়ে সুস্থ শিক্ষা, জ্ঞান ও স্বনির্ভর মানুষ হওয়ার পথে বাঁধা সৃষ্টি করেছে। কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে। অথচ কারিগরি শিক্ষা ও তার সুষ্ঠু ব্যবহার একটি দেশের ভিত্তি মজবুত করে গড়ে তুলতে অপরিহার্য। সামাজিক মর্যাদাবোধ, পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সম্প্রীতির বন্ধন ইত্যাদি পারিবারিক শিক্ষাসহ সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ থেকেও তাদেরকে দ্বিধাবিভক্ত করা হয়েছে। যথারীতি ঊচ্চপদস্থ যারা তাদের সন্তানদের এই পরিবেশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সুরক্ষিত রেখে দেশে বা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে আর রাজনীতির চর্চা চলে অতি সাধারণ বৃত্তের মানুষকে ঘিরে।
অবক্ষয়ের আর একটি শিকার আমাদের মুখের ভাষা। একদশক আগেও আমাদের কথন ভাষায় এত অবক্ষয় চোখে পড়েনি। মুখের ভাষা ভাব আদান-প্রদানে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। অশ্লীল ভাষার ব্যবহার ছাড়াও সাবলীল ভাষায়ও কঠিন প্রতিবাদ করা যায় তা আমাদের ছেলেমেয়েরা ভুলতে বসেছে। সেই সাথে নিষ্ঠুরতা, অমানবিক আচরণ দিন দিন সীমা ছাড়িয়েছে। বিচার হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিচারহীনতার ধারাবাহিক সংস্কৃতি হয়তো মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে বাধ্য করছে। এমন নিষ্ঠুরতা থেকে এই প্রজন্মকে ফেরানো দরকার নয়তো আগামী সময় সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বসে পড়বে। এদেশের আবহমান ধরে চলমান সংস্কৃতি, সম্প্রীতির বন্ধন, মানবিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়ার বিকল্প কিছু নেই। শিক্ষা, সুস্থ সংস্কৃতি ও মানবিকতার চর্চায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। শুভেচ্ছা সবাইকে।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট