সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ছাত্র-গণআন্দোলন একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটি গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে সরে গিয়ে একটি একনায়কতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছাত্রজনতা বিতাড়িত করে গণবিরোধী শাসক শেখ হাসিনা।
পলায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও তার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তখন থেকেই সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ ও ছাত্রসমাজ, দলটির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ সে দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধের অবস্থান বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। তবে যখন একটি দল সংবিধানবিরোধী আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পথে হাঁটে, তখন রাষ্ট্রের পক্ষে নীরব থাকা অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিগত সময়ে বিচার বিভাগের দুর্বলীকরণ, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন ফ্যাসিবাদী শাসনেরই পরিচায়ক।
অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ ধৈর্য ও বিচারবোধের পরিচয় দিয়েছে। তারা সংযম দেখিয়ে দলটির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন, যা ভবিষ্যতে যদি দলটি গণতান্ত্রিক আদর্শে ফিরে আসে, তবে তার মূল্যায়নের সুযোগ রেখেছে। কিন্তু আপাতত আওয়ামী লীগের বর্তমান কাঠামো ও নেতৃত্বের কারণে দেশের স্বার্থে এটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, বাংলাদেশ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান সহ্য করবে না। আগামী দিনের রাজনীতি হবে মুক্ত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। একটি দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ মানে এই নয় যে তার সদস্যরা চিরকালের জন্য রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হবেন; বরং এটি বোঝায় যে, পুরনো অবৈধ পথে নয়, নতুন করে গণতান্ত্রিক সীমানার মধ্যে পুনরায় সংগঠিত হতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ও উত্তরণের গল্পে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ একটি দুঃখজনক কিন্তু প্রয়োজনীয় অধ্যায়। ইতিহাস বিচার করবে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের বিজয় এবং ফ্যাসিবাদের পরাজয় হিসেবেই দেখা উচিত।