সম্পাদকীয়
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক যে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী হাসিনা শাসনের পতন হয়, সেই গণজোয়ারের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, যিনি ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রথম দফায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি পুলিশের উদ্যত বন্দুকের মুখে অসীম সাহসে সিনা টান করে দাঁড়িয়েছিলেন। দ্বিতীয় কিস্তির বুলেট এই বীরের বুক বিদীর্ণ করলে তিনি শহীদ হন।
আবু সাঈদের এই অসাধারণ আত্মত্যাগ গোটা জাতিকে শুধু উজ্জীবিতই করেনি বরং ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে টেনে এনেছিল। আবু সাঈদের মতো হাজারো তরুণ রাজপথে দাঁড়িয়ে যান দুই হাত প্রসারিত করে। তাদের মুখে স্লোগান আকারে উঠে আসে, ‘বুক পেতেছি গুলি কর...’। এরপর হাসিনা বাহিনী লাখ লাখ রাউন্ড গুলি-টিয়ারশেল, এমনকী হেলিকপ্টার থেকে আক্রমণ করেও মুক্তিকামী মানুষকে ঘরে ফেরাতে পারেনি। হাজারো মায়ের সন্তান বুকের তাজা রক্ত ঢেলে পতনোন্মুখ জুলুমশাহীর কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকে দেন। শেষাবধি জনরোষ থেকে পৈত্রিক প্রাণ বাঁচাতে ফ্যাসিস্ট শাসক হাসিনা তার সাঙ্গপাঙ্গকে বিপদের মুখে ফেলে নিজ বোনকে নিয়ে তড়িঘড়ি আকাশপথে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। আজও তিনি সেখানেই নিরাপত্তার বেড়াজালে মুখ লুকিয়ে আছেন। তার সাগরেদদের কেউ বিদেশে পালাতে পেরেছেন, কেউ দেশের মধ্যেই আত্মগোপনে আছেন, আবার কেউ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। পলাতক অথবা বন্দী অবস্থায় ফ্যাসিবাদী ও তাদের দোসর হাজার হাজার গণশত্রু বিচারের মুখোমুখি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মামলা ও বিচারের মুখে পড়েন তারা, যা নিষ্পত্তি হতে আরও বহু সময় লাগবে।
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে বৃহস্পতিবার। এতে সাঈদের বুকে গুলি করা দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড এবং গুলি ছোড়ার হুকুমদাতাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আইনকনিক ফিগার আবু সাঈদ হত্যামামলার রায়ে কেউ কেউ এই কারণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যে, খুনি হিসেবে চিহ্নিতরা উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এই যুক্তিতে যে, নির্দেশদাতাদের শাস্তি কম হয়েছে। তাদের মতে, গুলির হুকুমদাতাদের শাস্তি বাড়লে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হতো।
যেকোনো মামলার রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে এই ধরনের মতামত আসা স্বাভাবিক। তবে মামলার রায়ের মাধ্যমে এটি প্রমাণ হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদী হাসিনার তখতে তাউস রক্ষা করতে গিয়ে যারা খুন-খারাবিসহ নানা অন্যায়ে যুক্ত ছিলেন, তারা বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবেন না।
ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যত মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তা ছিল এই জনপদের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি পৃথিবীর অন্য কোনো আন্দোলনে এতো মানুষের সম্পৃক্তি ছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
এই রায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, অন্যায় করলে তার ফল ভোগ করতে হবে। বিশেষ করে জাতির ঘাড়ে চেপে বসা দুঃশাসন উৎখাতে জীবনদানকারীদের রক্ত বৃথা যাবে না। এই জনপদের মানুষ যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করেছিল, অনেকাংশেই তা পূরণ হয়নি। চব্বিশে রক্ত দেওয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষাও যেন বৃথা না যায়, তার জন্য আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। আমরা প্রত্যাশা রাখছি, সব খুনি-হুকুমদাতা আর তাদের পৃষ্ঠপোষক বা সহযোগীদের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হবে। তাহলেই দেশ ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।