সম্পাদকীয়
দুধ একটি শিশুর বেড়ে ওঠার মৌলিক খাদ্য। মায়ের বুকের দুধই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পুষ্টিকর শিশুখাদ্য হিসেবে গরুর দুধের ব্যবহারও ব্যাপক। শুধু শিশুরা কেন, রোগী ও বয়স্করাও পুষ্টির জন্য দুধ পান করেন। দুধ ব্যবহার হয় আমাদের দৈনন্দিন নানা পদের খাবার তৈরিতেও।
সম্প্রতি দুধ সংগ্রহের কেন্দ্রগুলোতে সরকারি কর্তৃপক্ষের অভিযানের পর যে তথ্য সামনে এসেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। শনিবার দৈনিক সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমাদের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যেমন আড়ং, আকিজ, প্রাণ- এই নামগুলো ভোক্তাদের আস্থার প্রতীক। কিন্তু তাদের কেন্দ্রগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এক ভয়াল জালিয়াত চক্রের; যারা সিলিকন জেলি ও নানা কেমিক্যালের মিশ্রণে দুধের নামে যা তৈরি বিক্রি করছে, তা আসলে বিষেরই নামান্তর।
সরবরাহকারীদের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ফুটেজ সুবর্ণভূমির কাছে রয়েছে; যেখানে সরবরাহকারীরাই বলে দিচ্ছেন, দুধ উৎপাদনের জন্য তাদের কোনো গাভীর প্রয়োজন নেই। শুধু বাজার থেকে কেমিক্যাল কিনলেই তৈরি হয়ে যায় তথাকথিত দুধ। এটা শুধু প্রতারণা নয়; এটি মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যু দিকে ঠেলে দেওয়া তথা গণহত্যার শামিল। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর ও র্যাব অভিযান চালিয়েছে বিষয়টি জনসমক্ষে এনেছে, তার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা অবশ্যই বাহবা পেতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কেন্দ্রগুলো কীভাবে দিনের পর দিন এই ভয়াবহ কাজ করে যেতে পারলো? কারা দিচ্ছিল তাদের পৃষ্ঠপোষকতা?
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এগুলো শুধু স্থানীয় স্তরে বিক্রি হচ্ছে না। আড়ং, প্রাণ, আকিজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের চেইনশপে এই তথাকথিত দুধ বিক্রি হয়। মাঠপর্যায়ের কেন্দ্রগুলো থেকে দুধ সংগ্রহের সময় সেগুলো পরীক্ষা করার কথা। অথচ সেসব কেন্দ্রে কোনো যোগ্য কেমিস্ট বা খাদ্যবিজ্ঞানী নেই! ভিন্ন বিষয়ে পড়ুয়া মানুষ দিয়ে পরীক্ষা করানোর ভান করা হয়। আর ব্র্যাকের মতো বড় সংস্থার কর্মকর্তারা মিডিয়ার মুখোমুখি হতে অস্বীকার করছেন। আসলে মিডিয়ার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য তাদের নেই।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এটা ‘বিষ’ ছাড়া আর কিছু নয়। যা ক্যানসারের মতো মারণব্যাধি ডেকে আনতে পারে। যারা এই দুধ পান করছে, তারা মূলত চুপিসারে মৃত্যু ফেরি করছে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা, যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।
আমাদের প্রশ্ন প্রশাসনকে, শুধু মোটা অঙ্কের জরিমানা করে ছেড়ে দিলেই হবে? এই অপরাধীদের কেন গুরুদণ্ড দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে না? কেন এই জালিয়াত ও তাদের সহযোগীদের বাণিজ্য শিকেয় উঠানো হবে না? বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বলে কি আইনের ঊর্ধ্বে থাকার কোনো বিধান বাংলাদেশের সংবিধানসহ প্রচলিত আইনে আছে? যে কেন্দ্রগুলোতে কোনো কেমিস্ট নেই, সেখান থেকে দুধ সংগ্রহ করার সুযোগ কে দিয়েছে?
আমরা প্রত্যাশা করি, নকল দুধ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোর তালিকা তৈরি করে সেগুলো দ্রুত সিলগালা করার উদ্যোগ নিন। আড়ং, প্রাণ, আকিজসহ সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানির দুধ বাজার থেকে সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হোক। যেসব সরবরাহকারী দুধের নামে বিষ বিক্রি করছে, তাদের শাস্তি যেন দৃষ্টান্তমূলক হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি ক্ষমতা দিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার বিধান করুন।
শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে বিষাক্ত কেমিক্যালের বোতল তুলে দেওয়া কোনো সভ্য জাতির পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না।
মোট কথা দুধের নামে বিষের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৎ খামারি ও কোম্পানিগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা বড় কর্পোরেট কোম্পানির একচেটিয়া বাজার নস্যাৎ করতে পারে। এই কাজটি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের অগ্রাধিকারে থাকা দরকার।