সম্পাদকীয়
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্ত যে ঠিক তা বলবো না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সব দাবি যে যৌক্তিক, তা-ও নয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় পাবলিক পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক। এই পরীক্ষা অবশ্যই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হওয়া উচিত না। আবার মন্ত্রী যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ অভিধায় অভিহিত করেছেন, তা-ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।
শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাবি করছেন, আবহাওয়া অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ‘বৃষ্টি হবে না’- এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন পরীক্ষার দিন সকালে কুমিল্লার একটি কেন্দ্র প্লাবিত দেখা যায়, তখন তা প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র দ্রুত উপরের স্তরে পৌঁছায়নি, অথবা পৌঁছালেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু একটি কেন্দ্রের কথা বললেও, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
অধিকন্তু, প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার জন্য ফ্যাসিবাদী সরকারের মডারেটরের ওপর দায় চাপানো কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। প্রশ্ন তৈরি ও পরীক্ষা পরিচালনার পুরো দায়িত্ব বর্তমান বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে প্রায় দুই বছর আগে।
দুর্গত পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত অযৌক্তিক কোনো দাবি নয়। তবে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ তাদের ভাষায় প্রশ্নপত্র ‘সহজ’ করার যে দাবি তুলছেন, তা অগ্রহণযোগ্য। ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহের বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে এবং সরকার এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। সেকারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এই দাবি সামনে রাখার আর কোনো মানে হয় না।
শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাদের প্রতি বৈরী মনোভাব নয়, বরং সহমর্মিতা ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে। শিক্ষামন্ত্রীর উচিত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও দূরদর্শী ও মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আমরা সরকারকে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করবো। তা হলো, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনে তরুণদের ভূমিকা। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কোটাবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আপাতত ‘অল্পকিছু তরুণের রাস্তায় নামা’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মনে রাখা দরকার বেফাঁস কথা তখন শেখ হাসিনাকে কীভাবে ডুবিয়েছিল। স্বৈরশাসক হাসিনা যেদিন আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করেন, সেদিনই তার পতনের ঘণ্টা বেজে যায়। এরপর রাজপথে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েও তিনি মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারেননি।
আজ আবার সেই ধরনের তাচ্ছিল্যের সুর দেখা যাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে। মন্ত্রীর মুখ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিশানা করে যখন ‘ফার্মের মুরগি’ বলা হয়, তখন ধরে নেওয়া অমূলক হবে না যে, এহছানুল হক মিলন আওয়ামী সরকারের পরিণতি বিস্মৃত হয়েছেন।
বর্তমান সরকার জনবিচ্ছিন্ন নয়। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এই সরকারের মন্ত্রীদের মুখ থেকে বেফাঁস কথা অনাকাক্সিক্ষত। বিশেষ করে সরকারপ্রধান যখন তার পরিশীলিত আচরণ দিয়ে দেশবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন, তখন তার মন্ত্রিসভায় অর্বাচীনের মতো বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তির অবস্থান বেমানান।
মনে রাখতে হবে, জনগণের সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে মহলবিশেষ ওত পেতে আছে। তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেওয়া কোনো সিনিয়র রাজনীতিকের কাজ হতে পারে না।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরও সজাগ থাকতে হবে যেন, তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে অন্য কেউ খাওয়ার সুযোগ না পায়। বিশেষ করে ‘প্রশ্ন সহজ করার’ দাবি কোনো পড়ুয়ার মুখ দিয়ে আসা বেমানান। অবান্তর এই একটি দফা অন্য যৌক্তিক দাবিগুলোকে চাপা দিতে যথেষ্ট।