যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

গণস্বাক্ষরে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন:

ঝিকরগাছায় বিএনপির তিন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ : সোমবার, ২ নভেম্বর,২০২৬, ০২:১০ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২ নভেম্বর,২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
ঝিকরগাছায় বিএনপির তিন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

যশোরের ঝিকরগাছায় বিএনপির তিন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি ও ফলের বাগান দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি সম্পদ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয়, শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এসব ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গত ১১ অক্টোবর যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর গণস্বাক্ষরযুক্ত একটি লিখিত আবেদন করেন শিমুলিয়া ইউনিয়নের দোসতীনা ও জামালপুর এলাকার বাসিন্দারা।

অভিযোগপত্রে ২৪ জন ভুক্তভোগীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে এলাকার ১২৩ জন বাসিন্দা স্বাক্ষর করেছেন।

অভিযুক্তরা হলেন—দোশতিনা ও জামালপুর দুই নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদ ওরফে টাক মজিদ, শিমুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য মিজানুর রহমান মিজা এবং একই গ্রামের ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুর ঢালী।

আবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের পর থেকে অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করেছেন। এছাড়া দোসতীনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি মেহগনি গাছ কেটে বিক্রি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

২৪ জনের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগে ২৪ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে মাঠপাড়া এলাকার মৃত শের আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের কাছ থেকে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা, মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে শাহিনের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, মৃত ইউসুফ নায়েবের ছেলে মিলনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা এবং মৃত আজাহার আলীর প্রবাসী ছেলে শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ইমরান চৌকিদারের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার, বজলুর ছেলে তুহিনের কাছ থেকে ৪৫ হাজার, শওকত আলীর কাছ থেকে ৪১ হাজার, রাশেদ আলীর কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং জামালপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তালিকার অন্য ব্যক্তিদের কাছ থেকেও জনপ্রতি দশ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

সালিশ ও বাগান দখলের অভিযোগ
মালয়েশিয়া প্রবাসী শহিদুল ইসলামের স্ত্রী জহিরুন্নেসা অভিযোগ করেন, ‘৫ আগস্টের পর টাক মজিদ রাতে আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে ও আমার ছেলেকে মারধর করে দেড় লাখ টাকা নিয়ে যায়।’

আরেক ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিনের অভিযোগ, ‘আমার কাছ থেকে নগদ তিন লাখ টাকা নেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ বিঘা জমির ড্রাগন ফলের বাগান জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে। বাগানের শ্রমিকদের কাছ থেকেও টাকা আদায় করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার ন্যায়বিচার চাই।’

দোসতীনা গ্রামের শাহিনের অভিযোগ, ‘আমাদের ছোটবেলায় বাবা রবিউল নামে এক ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করেছিলেন। ওই জমির দখল নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে স্থানীয় বিএনপি নেতারা সালিশ করেন। সালিশের নামে আমার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হলেও তারা সেই টাকা রবিউলকে না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। বর্তমানে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, চাঁদার টাকা অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসতে হয়। এ নিয়ে ঝিকরগাছা থানায় একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি।

অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মজিদ ওরফে টাক মজিদ ফোনে বলেন, ‘এলাকায় কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন মানুষের পাওনা টাকা সালিশের মাধ্যমে আদায় করে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

মিজানুর রহমান মিজা বলেন, ‘দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে লাগবে—এটাই স্বাভাবিক। এলাকায় কোনো সমস্যা নেই।’ বিদ্যালয়ের গাছ বিক্রির বিষয়ে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।

শামসুর ঢালীর বক্তব্য, ‘আমরা সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য সাবিরা নাজমুল মুন্নী সমর্থিত গ্রুপের রাজনীতি করি। প্রতিপক্ষ গ্রুপ আমাদের হেয় করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এলাকায় কোনো চাঁদাবাজি নেই। বিগত ১৭ বছর আমরা নিজেরা নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাদের দ্বারা এলাকার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’

শিক্ষা বিভাগের বক্তব্য
গাছ বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে দোসতীনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরে বলেন, গাছ কাটার কোনো ঘটনা তার জানা নেই।

ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়ালিউর রহমানও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

তবে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘দোসতীনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন নতুন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, তখন সেখানে কোনো গাছ ছিল না। আর পুরনো ভবনের মালামাল নিয়ম মেনেই নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।’

দলীয় নেতাদের বক্তব্য
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবিরা নাজমুল মুন্নী বলেন, ‘আমার কাছেও উভয় পক্ষের অভিযোগ জমা পড়েছে। ঘটনার সত্যতা থাকলে অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে শাস্তির আওতায় আসতে হবে। দল তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।’

ঝিকরগাছা পৌর বিএনপির সভাপতি রুহুল আমিন সুজন বলেন, ‘অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমাদের দল দেশ পরিচালনা করছে। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে মাদক, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। অভিযোগের প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান সামাদ নিপুণ বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগে এলাকাবাসী এসপির কাছে আবেদন করেছেন বলে শুনেছি। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দল কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় নেবে না।’

পুলিশের বক্তব্য
ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া হাসান জানান, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এমন কোনো অভিযোগ হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। তবে বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

এদিকে ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী অবিলম্বে এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে চাঁদাবাজির টাকা উদ্ধার ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)