যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্থায়ীভাবে ভারতে চলে যেতে চেয়েছিলেন রঞ্জন, ইনজেকশন পুশ করেন পল্লী চিকিৎসক মিঠুন

রঞ্জন খুনে বিষাক্ত ইনজেকশন

একমাত্র ছেলে থাকেন রাজস্থানে, সহায়-সম্পদ হাতানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য

কাজী আশরাফুল আজাদ

, যশোর

প্রকাশ : সোমবার, ৯ নভেম্বর,২০২৬, ১২:০১ এ এম
রঞ্জন খুনে বিষাক্ত ইনজেকশন

বাংলাদেশে কাউকে খুন করতে সচরাচর আগ্নেয়াস্ত্র, চাকু বা ধারালো কোনো দেশি অস্ত্রের ব্যবহার, কখনওবা গলায় ফাঁস দেওয়া হয়। কিন্তু বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে কাউকে হত্যা করার কাহিনি খুবএকটা শোনা যায় না।

যশোরে গত ৭ নভেম্বর রঞ্জন মণ্ডল নামে যে ব্যক্তির বস্তাবন্দী মরদেহ মণিরামপুরে মুক্তেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার হয়, তাকে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন। আর যিনি এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন, তিনি ছিলেন রঞ্জনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মিঠুন ধর, যিনি পেশায় পল্লী চিকিৎসক।

ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে কী কারণে খুন করতে যাবেন একজন পেশাজীবী—সেই প্রশ্নের জবাবও উদ্ঘাটন করেছে সিআইডি। তাদের ভাষ্য, জমিজমা বিক্রি করে স্থায়ীভাবে ভারতে পাড়ি জমানোর তথ্য ‘বিশ্বস্ত’ মিঠুনকে শেয়ার করাই কাল হয়েছে রঞ্জনের।

অভিযুক্ত রঞ্জন ও তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকার অভিযোগে আরেক ব্যক্তিকে আটক করে আদালতে তুলেছে সিআইডি। শিগগির আরও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে আশাবাদী তদন্তকারীরা।

গত ৭ নভেম্বর মণিরামপুরের মহিষদিয়া গ্রামের হেলারের ঘাট ব্রিজ-সংলগ্ন মুক্তেশ্বরী নদী থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল রঞ্জন মণ্ডলের (৬০) মরদেহ। তিনি কেশবপুরের কালীচরণপুর গ্রামের হরিপদ মণ্ডলের ছেলে।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডটির রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামেন সিআইডি যশোর জোনের সদস্যরা। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম ৭ নভেম্বর সকাল থেকে ৮ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত একটানা তদন্ত করেন এবং বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই হত্যা মামলার দুই আসামিকে আটক করেন। উদ্ধার হয় নিহতের শরীর থেকে নেওয়া একটি সোনার আংটি, একটি সোনার চেইন, মোবাইল ফোনসেট। আর জব্দ করা হয় মরদেহ বহনের কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও ইনজেকশনের খালি শিশি।

আটক দুইজন হলেন, মণিরামপুর উপজেলার মহিষদিয়া মধ্যপাড়ার বিষ্ণুপদ ধরের ছেলে মিঠুন ধর (৩২) এবং সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদিয়ালী গ্রামের মৃত জব্বার গাজীর ছেলে আব্দুল হান্নান গাজী (৬৪)। এদের মধ্যে মিঠুনকে পালাতে সহযোগিতা করছিলেন আব্দুল হান্নান গাজী। সে কারণে তাকে আটক করা হয়েছে বলে সিআইডি জানিয়েছে।

এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের কারণ, কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো, কীভাবে লাশ নদীতে ফেলা হয়েছিলো, তার বিস্তারিত বর্ণনা সিআইডিকে দিয়েছেন আসামি মিঠুন ধর।

সিআইডি পুলিশ জানিয়েছে, আসামি মিঠুন ধরের বাড়িটি মণিরামপুর উপজেলায়। তার গ্রামের নাম মহিষদিয়া। মিঠুন একজন পল্লী চিকিৎসক। তার চেম্বারটি পাশের কেশবপুর উপজেলার কাটাখালি বাজারে। এই বাজারটি মণিরামপুর-কেশবপুর উপজেলার মধবর্তী স্থানে। মিঠুনের চেম্বারে ওঠা-বসা ছিলো নিহত রঞ্জনের। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

রঞ্জন একটি ঘের লিজ নিয়ে মাছ চাষ করতেন। তার একমাত্র ছেলে অনুপ মণ্ডল (২৬) ভারতের রাজস্থানে থাকেন। স্ত্রী বিউটি মণ্ডলকে নিয়ে তিনি কেশবপুরের কালীচরণপুরে বসবাস করতেন। তার স্ত্রী প্যারালাইজড। নিহত রঞ্জনের বেশ কিছু জায়গা-জমি আছে। ওই জমি বিক্রি করে দিয়ে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে স্থায়ীভাবে ভারতে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। তার আগে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই সব পারিবারিক তথ্য মিঠুনকে শেয়ার করেছিলেন রঞ্জন। মিঠুন মনে মনে বিষয়টি অন্যভাবে নেন। নিহত রঞ্জনের টাকা বা সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ফন্দি আঁটেন।

গত ৬ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে রঞ্জন কাটাখালি বাজারে মিঠুনের চেম্বারে যান ওষুধ নিতে। সেখান থেকে তিনি বাড়িতে ফিরে যান। বেলা ১২টার দিকে মিঠুন তাকে ফোন দেন। বলেন, ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একটি মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফোন পেয়েই রঞ্জন ফের চলে যান মিঠুনের চেম্বারে। সেখানে গেলে মিঠুন তার সুস্থতার কথা বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটি ইনজেকশন পুশ করেন। সেই ইনজেকশনটি ছিল বিষাক্ত ‘ডেকলোফেন প্লাস’। ইনজেকশন নেওয়ার কিছু সময় পর ওই চেম্বারের মধ্যেই মারা যান রঞ্জন।

সিআইডির ভাষ্যমতে, চেম্বারের ভেতর থেকে লাশ কীভাবে বের করবেন, তার জন্য মিঠুন অপেক্ষা করতে থাকেন। কারণ সে সময় জুমার নামাজের জন্য রাস্তায় ও বাজারে লোকজন ছিলো। জুমার পর বাজার ফাঁকা হয়ে গেলে একটি বস্তার মধ্যে মরদেহ ভরে মুখ বেঁধে ফেলেন তিনি। নিহত রঞ্জন ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের; খুব বেশি উঁচু-লম্বাও ছিলেন না। ফলে সহজেই মরদেহটি বস্তাবন্দী করে ফেলেন মিঠুন একই। এরপর তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের পেছনে বেঁধে বস্তাবন্দী মরদেহ নেওয়া হচ্ছিল বাড়ি দিকে। পথ একটি ঘেরের সামনে বস্তার মুখ খুলে যায়। মোটরসাইকেল থেকে নেমে বস্তার মুখ বাঁধতে যান মিঠুন। সে সময় নিহতের পকেট থাকা মোবাইল ফোনসেটটি পড়ে যায়। মিঠুন ওই ফোনসেটটি আর উঠাননি। বস্তাবন্দী মরদেহ নেওয়া হয় মণিরামপুরের হেলারহাট বাজারের অদূরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে। সেখানে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন মিঠুন। সেখানেই বস্তার মুখ খুলে মরদেহের শরীর থেকে সোনার চেইন ও আংটি খুলে নেওয়া হয়। পরে রাতের আঁধারে বস্তাটি ‘নীলিমা নিবাস’ নামে বৃদ্ধাশ্রমের পুব পাশে হেলারহাট ব্রিজ-সংলগ্ন মুক্তিশ্বরী নদীতে ফেলে দেন মিঠুন।

প্রশ্ন হলো, সিআইডি এতো দ্রুত এই হত্যারহস্য উন্মোচন করলো কীভাবে?

সিআইডি সূত্রটি জানিয়েছে, তাদের সদস্যরা নিহতের বাড়িতে যান। এরপর তারা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে রঞ্জনের জীবনের শেষ সময়ের অবস্থানগুলো নির্ণয় করেন। ৬ নভেম্বর বেলা ১২টার দিকে রঞ্জন কাটাখালি বাজারে মিঠুনের চেম্বারে গিয়ে আর বের হননি বলে জানতে পারেন সিআইডি কর্মকর্তারা। বিষয়টি সিআইডি আরও নিশ্চিত হয় মিঠুনের চেম্বারের একটু দূরে একটি দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে।

এরপর মিঠুনের খোঁজ করতে থাকে সিআইডি। কিন্তু তার দোকান ও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। তারা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মিঠুনের অবস্থান ৮ নভেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদলিয়া গ্রামে বলে নিশ্চিত হন। সিআইডি খোঁজ নিয়ে দেখে, ওই গ্রামে বসবাস আব্দুল হান্নান গাজীর; যিনি ভারতে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের কাজে নিযুক্ত বলে অভিযোগ আছে। তার বাড়িতে গিয়ে সিআইডি কর্মকর্তারা দুইজনকেই পেয়ে যান। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আব্দুল হান্নানের সহায়তায় মিঠুন ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে সিআইডি পুলিশ ধারণা করে।

রঞ্জন হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাতিজা দেবাশীষ মণ্ডল বাদী হয়ে মণিরামপুর থানায় হত্যা মামলা রুজু করেন। সিআইডি ওই মামলায় আটক দেখিয়ে ৮ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে মিঠুন ধর ও আব্দুল হান্নান গাজীকে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, এই মামলায় মিঠুন ধরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভিকটিমের ব্যবহৃত সোনার চেইন ও আংটি এবং লাশ বহনে ব্যবহৃত মিঠুনের মোটরসাইকেল তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া কাটাখালি বাজারে মিঠুন ধরের দোকান থেকে ভিকটিমকে পুশ করা ইনজেকশনের খালি অ্যাম্পুলও (শিশি) উদ্ধার করা হয়; যা আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান বলেন, ঘটনার শুরু থেকে সিআইডি পুলিশ অনুসন্ধান করেছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামি আটক করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আরো তদন্ত করা হবে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে আদালতে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)