ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
সংঘর্ষে একজন কৃষকের মৃত্যুর পর গোটা গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। লুটপাটের ভয়ে লোকজন তাদের গরু-ছাগল পাঠিয়ে দিচ্ছেন অত্মীয়বাড়িতে।
এ ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা মনোহরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে।
আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় এই এলাকায় বিএনপির দুই গ্রপের সংঘর্ষে একজন কৃষক মারা যান। এরপর থেকে গ্রামজুড়ে লুটপাট ও বাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার সকাল থেকে দিনব্যাপী পুলিশের উপস্থিতিতে আসামিপক্ষের গরু-ছাগল নিরাপদ রাখতে স্বজনদের কাছে বুঝে দেওয়া হয়। গ্রামের প্রায় ১৫টি পরিবার গাড়িতে করে বিভিন্ন গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতিতে প্রায় ২৫টি গরু ও ছাগল পাঠিয়ে দেয়। সেসময় পুলিশকে তাদের নাম পরিচয় এবং গরু-ছাগলের সাথে ছবি তুলে রাখতে দেখা যায়। হত্যার ঘটনাকে পুঁজি করে যেনো লুটপাট না হয় সেটা রুখতেই এই উদ্যোগ।
গত ২৩ এপ্রিল সকালে শৈলকুপা উপজেলার মাধবপুর গ্রামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন, শৈলকুপা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আবুল বাশার তরিকুল সাদাত ও জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থকদের সংঘর্ষে মোহন শেখ (৬০) নামে একজন কৃষক নিহত হন। নিহত মোহন শেখ আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থক ছিলেন। এই ঘটনায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫/২৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ছেলে আব্দুর রশিদ শেখ।
আবুল হোসেন গ্রুপের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আবু জাহিদ গ্রুপের লোকজন আবুল হোসেন গ্রুপের সমর্থকদের বাড়িতে লুটপাট ও ভাংচুর চালায়। দুই দিনে ৪০টি বাড়ি ও দোকানপাট ভাংচুর করে এবং অন্তত ৬৫টি গরু-ছাগল লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু গরু-ছাগল পুলিশ উদ্ধার করে দিয়েছে। এদিকে, মামলার কারণে বাড়িছাড়া আবুল হোসেন গ্রুপের পুরুষ সদস্যরা। সেই সুযোগে আবারও লুটপাটের ভয়ে গরু-ছাগল ও মূল্যবান জিনিসপত্র আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
দুপুরে কথা হয় মাধবপুর গ্রামের সুফিয়া খাতুন নামে এক নারীর সাথে। তিনি পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধরপুর গ্রামে আত্মীয় বাড়িতে দুটি গরু পাঠাতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা চাই যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার হোক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গ্রামে যারা আবুল হোসেনের সমর্থক কিন্তু ভালো মানুষ তাদের নামেও মামলা দিয়েছে। এই কারণে প্রায় সব বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই। কখন আমাদের গরু লুট করে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
মনিরা খাতুন নামের আরেক নারী তার বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে গরু পাঠাতে এসেছেন। তিনি বলেন, বৃদ্ধ ও শিশুরা ছাড়া আমাদের সমাজে কোনো পুরুষ লোক বাড়িতে নেই। একটি গরু কোরবানি ঈদের জন্য লালনপালন করছিলাম। ঈদের বাজারে তুললে দুই লাখের উপরে দাম হবে। কখন লুট হয়ে যায় এই ভয়ে আমার মামা শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবুও আমরা আইনমন্ত্রীর নির্দেশে এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। হত্যার সময় আমার গ্রুপের অন্তত ১৫টি বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করেছে প্রতিপক্ষ। তারা নিজেরা গরু সরিয়ে ফেলে আমাদের নামে অভিযোগ দিচ্ছে গরু লুটের। হত্যার দিন থেকেই দুইবেলা প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্যকে খাবার দিচ্ছি। নেতাকর্মীদের নিয়ে পাহারা দিচ্ছি। কিন্তু কতক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখবো, তাই যাদের বাড়িতে বড় গরু-ছাগল রয়েছে পুলিশের কাছে নাম লিখিয়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে পাঠানো ব্যবস্থা করেছি। যাতে আমার গ্রুপের লোকজনের বিরুদ্ধে গরু লুটের অভিযোগ করতে না পারে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আবুল বাশার তরিকুল সাদাত জানান, হত্যার দিন থেকে গতকাল রাত পর্যন্ত আবু জাহিদের লোকজন আমাদের গ্রুপের অন্তত ৪০টি বাড়ি ভাংচুর এবং ৭০টির মতো গরু লুট করেছে। তাৎক্ষণিক পুলিশকে অভিযোগ দিলে ১৫/২০টির মতো গরু উদ্ধার করে মালিকের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। এখনো থানায় কয়েকটি উদ্ধার করা গরু রয়েছে।
তিনি বলেন, আবু জাহিদ মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন। আমার বাবা আবুল হোসেনও এই ইউনিয়নে নির্বাচনে করবেন। সেই কারণে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নয় কিন্তু আমাদের গ্রুপ করে এমন মানুষদের নামে মামলা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলার কারণে মাধবপুর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। মানুষের বাড়িঘরের কোনো নিরাপত্তা নেই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শৈলকুপা থানার এসআই আবুল কাশেম বলেন, শনিবার নিহতের ছেলে বাদী হয়ে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫/২৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার মূল আসামিকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। সংঘর্ষের পর থেকেই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। অভিযোগ পেয়ে বেশ কয়েকটি গরু উদ্ধার করে মালিকের কাছে দিয়েছি। আজকে প্রায় ১৫টি পরিবারের গরু-ছাগল তাদের আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
তিনি বলেন, মামলা হওয়ার পরে আসামিরা পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাদের প্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।