এম জুবায়ের মাহমুদ
, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
খোলপেটুয়া নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ বসতঘর। নদীর পানির সঙ্গে দূরত্ব তিন ফুটেরও কম। জোয়ার এলেই পানি ছুঁয়ে যায় ঘরের মেঝে। নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ে বাড়ির পাশেই। সামনে বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড় মৌসুম তাই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের বড় কুপট ২ নম্বর ওয়ার্ডের গফফার ও তার পরিবারের।
সরেজমিনে দেখা যায়, খোলপেটুয়া নদীর একেবারে কিনারায় বাঁশ দিয়ে পাইলিং করে কিছু জায়গা ঘিরে সেখানে মাটি ভরাট করে ছোট্ট একটি বসতভিটা তৈরি করেছেন গফফার। সেই জায়গার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে তাদের বসতঘর। নদীর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বাড়ির পাশেই। চারপাশে ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। সামান্য বড় জোয়ার বা বৈরী আবহাওয়া হলেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
৪৫ বছর বয়সী গফফারের পৈতৃক বাড়ি আটুলিয়া ইউনিয়নের হেঁচি এলাকায়। তবে, সেখানে বাবার কোনো জমিজমা না থাকায় কয়েক বছর আগে বাধ্য হয়ে নদীর তীরে এই চরে বসতি গড়েন তিনি। বর্তমানে বসতভিটা ছাড়া তাদের আর কোনো জমি নেই।
পরিবারে সদস্য চারজন। স্ত্রী সানজিদা খাতুন (৩৫) এবং ১২ ও ৭ বছর বয়সী দুই সন্তানকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটে। অভাব-অনটনের কারণে সন্তানদের লেখাপড়াও নিয়মিত চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
গফফারের জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে ২০১২ সালে, বরিশালের একটি ইটভাটায় কাজ করার সময়। দুর্ঘটনায় মেশিনে কেটে যায় তার একটি হাত। সেই থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। বর্তমানে খোয়া ভাঙার কাজ করে মাসে গড়ে প্রায় দশ হাজার টাকা আয় করেন। এই সামান্য আয়ে সংসারের খরচ চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তার ওপর চিকিৎসা, ঘর রক্ষণাবেক্ষণ ও সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারটিকে।
গফফারের স্ত্রী সানজিদা বলেন, `আমাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। তাই বাধ্য হয়ে নদীর ধারে থাকি। জোয়ার এলে ঘরে পানি উঠবে উঠবে অবস্থা। ঝড়ের সময় রাতভর ঘুম হয় না। সব সময় ভয় লাগে কখন ঘরটা নদীতে ভেঙে যায়।'
তিনি জানান, এর আগেও বড় ঝড়ে তাদের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে স্থানীয় একটি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে কোনোরকমে ঘরটি আবার বসবাসের উপযোগী করা হয়। তবে, এখনো সেই ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দুইটা বাচ্চা নিয়ে সব সময় ভয় লাগে। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই মনে হয় এই বুঝি ঘরটা ভেঙে গেল। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
নদীর পানির সঙ্গে বসতভিটার দূরত্ব এতটাই কম যে বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হলে মুহূর্তেই ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ, ভূমিহীনদের জন্য সরকারের দেওয়া ঘরেও গফফারের নাম ওঠেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা জালাল উদ্দিন বলেন, গফফারদের কোনো জায়গা-জমি নেই। তাই বাধ্য হয়ে নদীর ধারে থাকে। ঝড়-বৃষ্টির সময় তাদের অবস্থা দেখলে সত্যিই কষ্ট লাগে।
প্রতিবেশী রেজাউল বলেন, বউ-বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটায় তারা। এলাকার অনেকেই সরকারি ঘর পাইছে, কিন্তু গফফার কোনো সুযোগ পায়নি।
আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ বাবু বলেন, `বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা এলে তাকে দেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও অস্বাভাবিক জোয়ারের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন গফফারের মতো ভূমিহীন ও দরিদ্র পরিবারগুলো।'
গফফার প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও অন্য কোনো সরকারি সহায়তা পান না। দুর্যোগের সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্য নিকটতম আশ্রয়কেন্দ্রও কয়েক কিলোমিটার দূরে। ফলে হঠাৎ কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে পরিবারটিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়।
খোলপেটুয়া নদীর দিকে তাকিয়ে সানজিদা বলেন, `আমি নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারি। কিন্তু ঝড় আইলে বাচ্চাগুলোর জন্য খুব ভয় হয়। একটা নিরাপদ থাকার জায়গা পাইলে আর কোনো চাওয়া থাকতো না।'