বৃষ্টি-দমকা হাওয়ায় স্থবির জনজীবন, বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত
বাগেরহাট প্রতিনিধি
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। রোববার রাত থেকে আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন রয়েছে। দফায় দফায় দমকা হাওয়ার সঙ্গে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। উত্তাল সাগরের কারণে মোংলা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপের প্রভাবে মোংলা সমুদ্রবন্দর ও সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় তীব্র বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। রোববার থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পর্যন্ত টানা তিন দিন ধরে এ অঞ্চলে সূর্যের দেখা মেলেনি।
দিনভর আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা থাকছে এবং বিরতিহীনভাবে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।
টানা এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে উপকূলীয় জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন নিম্নআয়ের দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষরা। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলায়।
সেখানে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য খালাস ও বোঝাই কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
টানা ৭২ ঘণ্টার বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার কারণে মোংলা পৌর শহরসহ সুন্দরবন-সংলগ্ন চিলা, বুড়িরডাঙ্গা, চাঁদপাই ও মিঠাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না।
সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ইজিবাইক চালক এবং পশুর ও মোংলা নদীর খেয়াঘাটের মাঝিরা।
মোংলা পৌর শহরের কবরস্থান সড়কের এক রিকশাচালক বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারছি না। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে, আবার রাস্তায় কোনো যাত্রীও নেই। দিনে এক-দেড়শ টাকাও আয় হচ্ছে না। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’
একই অবস্থা সুন্দরবনের নদী-খালে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করা মৎস্যজীবীদের। নদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। ফলে অনেক জেলের পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের মালামাল খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ ধীরগতিতে চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার বিভাগ জানিয়েছে, বন্দরে বর্তমানে ক্লিংকার, সার, কয়লা ও খাদ্যশস্যবাহী বেশ কয়েকটি বিদেশি জাহাজ অবস্থান করছে।

বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় খোলা পণ্য (বাল্ক কার্গো) যেমন চাল ও সার খালাসের কাজ বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কারণ খোলা অবস্থায় এসব পণ্য বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কন্টেইনার এবং যান্ত্রিক উপায়ে খালাসযোগ্য অন্যান্য পণ্যের কাজ সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে।
পণ্য খালাস ধীরগতির হওয়ায় বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে টানা বৃষ্টি ও বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধির কারণে মোংলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পশুর নদীসহ উপকূলীয় নদীগুলোর পানির উচ্চতা স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১ থেকে ২ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চরাঞ্চলের কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ থেকে বনের অভ্যন্তরে থাকা সকল ক্যাম্প, ফাঁড়ি ও টহল দলকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বনের ভেতরের নদী বা খালে আশ্রয় ছাড়া কোনো নৌযান চলাচল না করে, সেদিকেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মোংলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় আরও অন্তত দুই থেকে তিনদিন বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। হঠাৎ ভারী বর্ষণে উপকূলের মৎস্যচাষি ও চিংড়ি ঘের মালিকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ঘের মালিকদের ঘেরে পানি জমে না রেখে ভাটার সময় বেড়িবাঁধ কেটে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।’