সবুজ কলাপাতা সংগ্রহ আর বিপণনের ওপর ভর করে মণিরামপুরের অলক দাস (৪০) সচল রেখেছেন নিজের সংসারের চাকা। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কলাপাতা বিক্রি করে শুধু নিজের সংসারের চাকাই ঘোরাননি, তৈরি করেছেন বেশকিছু মানুষের জীবিকার সুযোগ।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ভোজগাতী ইউনিয়নের দোনার গ্রামের শ্যামাপদ দাসের ছেলে অলক দাস। জীবিকার মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন কলাপাতা সংগ্রহ ও বিক্রির কাজ। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে ঘুরে গাছের মালিকদের কাছ থেকে এক টাকা দরে কেনেন কলাপাতা। প্রতিদিন সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।
কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে অলক দাস বলেন, প্রতিদিন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার পিস পাতা কিনে থাকি। প্রতিটি পাতা কেটে কয়েক খণ্ড করা হয়। সেগুলো গুছিয়ে বান্ডিল করে এক হাজার খণ্ড পাতা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে স্থানীয় বিভিন্ন হাট-বাজার এবং শহরের মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। মাছ ব্যবসায়ীরা ক্যারেটে মাছ সতেজ রাখতে এসব কলাপাতা ব্যবহার করেন, যা পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালান হয়।
তিনি আরও জানান, উপার্জনের এই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ, ছেলে-মেয়ের পড়ালেখাসহ পরিবারের সদস্যদের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করেন। বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভালোভাবেই চলছেন তিনি।
অলকের অধীনে কাজ করা শ্রমিক সুব্রত দাস, চয়ন দাসসহ কয়েকজন জানান, তাদের কাজ কখনো বন্ধ হয় না, নিয়মিত কাজ থাকে। মাস শেষে তারা ১২ হাজার টাকা করে বেতন পান। অলকের এই ব্যতিক্রমী চিন্তার কারণে তাদের কর্মসংস্থান হয়েছে, পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচেবর্তে আছেন।
মাছের ক্যারেটে কলাপাতা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মণিরামপুরের মাছবাজারের জয় ফিস মাছের আড়ৎ মালিক অলক হালদার বলেন, ‘আমাদের আড়ৎ থেকে প্রতিদিন মণ মণ মাছ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালান হয়। মাছ সতেজ ও তাজা রাখার জন্য ক্যারেটে বরফ ও কলাপাতা দেওয়া হয়। প্লাস্টিকের চেয়ে কলাপাতায় মাছ বেশি সময় ভালো থাকে এবং দাগ পড়ে না। তাই মাছের চালান পাঠাতে কলাপাতা ব্যবহার করি।’
যেসব গৃহস্থের কাছ থেকে অলক কলাপাতা কেনেন, তাদেরই একজন মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগে কলার পাতা গাছেই শুকিয়ে নষ্ট হতো, ঝড়ে ভেঙে পড়ে থাকতো, যা আমাদের কোনো কাজেই আসতো না। এখন অতিরিক্ত পাতা নষ্ট হওয়ার আগে বিক্রি করে দিই। বিনিময়ে আমরা নগদ টাকা পাই। এতে একদিকে যেমন গাছ সতেজ হয়, কোনো পরিশ্রম ছাড়া বাড়তি কিছু আয়ও হয়।’
প্রবীণেরা জানান, মাছ, মিষ্টি প্রভৃতি খাদ্যবস্তু দীর্ঘসময় সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের জন্য প্রাচীন কাল থেকেই কলাপাতার ব্যবহার রয়েছে। তবে কলাপাতা সংকটের কারণে এখন অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তবে প্রকৃতি থেকে পাওয়া কলাপাতা কারখানায় উৎপাদিত প্লাস্টিক, পলিথিন বা শোলার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব। ফলে যেখানে এখনও কলাপাতা পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট কারবারিরা এই প্রাকৃতিক জিনিসটি ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।