সম্পাদকীয়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যশোর জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা সুরক্ষা না থাকা চলমান ডেঙ্গু মোকাবিলা প্রচেষ্টায় গভীর অব্যবস্থাপনার প্রকাশ। আইইডিসিআর যখন বারবার যশোর সদর ও অভয়নগর উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করছে, তখন সেখানে অবস্থিত প্রধান সরকারি হাসপাতালের এমন উদাসীনতা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, যশোর জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে। এই অবস্থা যে বিপজ্জনক, তা ডাক্তারদের চেয়ে আর কারও বেশি বোঝার কথা না। তাহলে বাস্তবতা বলছে, হাসপাতালটিতে ব্যবস্থাপনাগত সংকট রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই হাসপাতালই ডেঙ্গু বিস্তারের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একজন ডেঙ্গু রোগীকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা যখন পরবর্তীতে অন্য রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি, তাদের অ্যাটেনডেন্ট কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীকে কামড়ায়, তখন সংক্রমণের একটি শৃঙ্খল তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এটি অতি সাধারণ গণিত; যা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াতের ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার আশ্বাস আমাদের আশ্বস্ত করতে পারছে না। যখন কোনো জেলার প্রধান হাসপাতালের শীর্ষ কর্তা দ্বিধাগ্রস্ত ও পরিকল্পনাহীন, তখন সেখানকার রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। রোগী ও তাদের স্বজনদের আতঙ্ক- যারা ডেঙ্গু নিয়ে আসেননি, কিন্তু হাসপাতালে এসে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আছেন- সম্পূর্ণ যৌক্তিক। তাদের সুরক্ষা দেওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, যা এখানে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত মে মাসে যশোর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৯, যা আগস্টের শুরুতে ৩৫৩-এ পৌঁছেছে। এমন প্রেক্ষাপটে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেলের মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হন না; পরবর্তী ৪৮-৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই সূক্ষ্ম বিষয়টিও যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমলে না নেয়, তাহলে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগী ব্যবস্থাপনা- সব পর্যায়েই ফাঁক থেকে যাবে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের এই পরিস্থিতি আসলে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনাকে এখনও ‘জরুরি’ হিসেবে না দেখে ‘রুটিন’ কাজ হিসেবে দেখার শামিল। তবে যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই। কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, পর্যাপ্ত মশারি, রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
যশোরের সিভিল সার্জনের মুখে ‘ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখার প্রয়োজনীয়তা’ সম্পর্কিত বক্তব্য যদি কেবল কথায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখবে না। রোগীর জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেই। যশোর জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি চলমান ডেঙ্গু মোকাবিলা কার্যক্রমে যেন ‘ওয়েক-আপ কল’ হিসেবে কাজ করে, আমরা সেই প্রত্যাশা রাখছি।