উদ্ভিদবিদ্যা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
স্টেভিয়ার দ্বিপদী বা বৈজ্ঞানিক নাম Stevia rebaudiana. স্টেভিয়া নিয়ে দুজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানীর অবদান স্মরণে উদ্ভিদটির ‘গণ’ ও ‘প্রজাতি’ নাম স্থির হয়েছে। ‘গণ’ নাম Stevia হচ্ছে স্পেনিশ বোটনিস্ট ও চিকিৎসক Pedro Jaime Esteve (১৫০০-১৫৫৬) স্মরণে। লাতিন ভাষায় তার নামের প্রতিবর্ণায়ন হচ্ছে Petrus Jacobus Stevus. তিনি প্রাকৃতিক চিনি স্টেভিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছিলেন। আর প্রজাতি নাম rebaudiana এসেছে প্যারাগুয়ের রসায়নবিদ Ovidio Rebaudi (১৮৬০-১৯৩১) এর সম্মানে। সুইস বোটানিস্ট Moses Giacomo Bertoni-র আহ্বানে ১৮৯৯ সালে তিনিই প্রথম স্টেভিয়ার মিষ্টি যৌগগুলো আলাদা ও নিষ্কাশন করেছিলেন।
দক্ষিণ আমেরিকার জনগণ হাজার হাজার বছর ধরে স্টেভিয়ার মিষ্টতার কথা জানতো। তবে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে গুয়ারানি নামের প্যারাগুয়ের আদিবাসীদের মাধ্যমে। তারা স্টেভিয়াকে caà-ehe (মিষ্টি ঘাস) নামে আখ্যায়িত করেন। তারা mate নামক প্যারাগুয়ের চায়ের মূল ভেষজ Ilex paraguayensis-র বেজায় তেতো স্বাদের মাত্রা কমিয়ে আনতে তাতে স্টেভিয়া যোগ করেছিলেন।
বিশ্বে স্টেভিয়ার প্রায় দেড়শোটি প্রজাতি রয়েছে। তার মধ্যে একমাত্র Stevia rebaudiana-য় রয়েছে মিষ্টির গুরুত্বপূর্ণ সব উপাদান (stevioside, rebaudioside A, rebaudioside C, dulcoside A)। স্টেভিয়া পাতায় মিষ্টতার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
এক সময় চিনি কোম্পানিগুলো স্টেভিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। তবে ২০০৮ সালে এফডিএ rebaudioside-কে ফুড অ্যাডিটিভ হিসেবে স্বীকার করার ছয় বছর পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও একই পথে হাঁটে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে স্টেভিয়ার মূল দুটি জাগতিক বাধা অপসারিত হয়। aspartame-এর মতো সিনথেটিক সুইটেনারগুলো সময়ের ব্যবধানে মান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু rebaudioside দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ও উচ্চতাপমাত্রায় অবিকৃত থাকে। তাই বেকড পণ্য বলুন আর হট ড্রিংকসই বলুন, স্টেভিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী এখন স্টেভিয়াই। স্টেভিয়ার সবচেয়ে সুবিধা হলো, এর মিষ্টি উপাদানগুলোর কোনো পুষ্টিমান নেই। অর্থাৎ এটা জিরো ক্যালরির। অবশ্য বিভিন্ন দেশের দীর্ঘদিনের ডাটা ব্যবহার করে এফডিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্টেভিয়ার maximum daily dose নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটি এখন জাপানের ডায়েট কোকেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা যায়, পৃথিবীর সেরা সুগারটি আসলে সুগারই নয়! অথবা বলা যায়, স্টেভিয়া ক্যালরিহীন স্বাস্থ্যসম্মত সুগার।
স্টেভিয়ার সুবিধা হলো, এর তাজা পাতা যেমন খাওয়া যায়, তেমনি পাউডারও খাওয়া যায়। হাইড্রো-অ্যালকোহলিক তরল হিসেবেও গ্রহণ করতে সমস্যা নেই। সব অবস্থায় এটা জিরো-ক্যালরিক সুইটেনার। স্টেভিয়া Asteraceae পরিবারের বহুবর্ষজীবী ওষধি গুল্ম।
বর্তমানে জাপান, চীন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও প্যারাগুয়ে স্টেভিয়ার প্রধান উৎপাদক। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. এমএস বার্টনি স্টেভিয়াকে প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। স্টেভিয়ার আদিনিবাস, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা।
স্টেভিয়া ৬০ থেকে ৭৫ সেমি. পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতার আকার বর্ষাকৃতি, ফুল সাদা এবং বীজ ক্ষুদ্রাকৃতির। এর পাতা কাঁচা অথবা সবজি হিসেবে রেঁধেও খাওয়া যায়।
অনেকটা তুলসীর মতো দেখতে এই সবুজ উদ্ভিদটি বাংলাদেশের কৃষকদের কাছে ‘মধু গাছ’ বা ‘চিনি পাতা’ নামেও পরিচিত। দেশের কৃষিতে নতুন চমক হিসেবে বলা হচ্ছে এই স্টেভিয়াকে। পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা আসায় রাজশাহীতে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে উচ্চমূল্যের এই ফসল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন মাস পরপর সংগ্রহ করা যায় এই গাছের পাতা। এরপর তা শুকিয়ে গুঁড়ো করে ব্যবহার করতে হয়। তবে এর কাঁচা পাতা গরম পানিতে দিলেও পাওয়া যাবে চিনির মতোই মিষ্টি স্বাদ। এর এক কেজি গুঁড়ো ৪০ থেকে ৫০ কেজি চিনির সমান। তাই বলা হয় ‘স্টেভিয়া’ চিনির চেয়েও অনেক বেশি মিষ্টি। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চিনির বিকল্প হিসেবে স্টেভিয়া ও এর নির্যাস ব্যবহার করছে।
আমাদের দেশে স্টেভিয়ার ব্যবহার খুবই সীমিত হলেও জাপান, কানাডার মতো দেশে ডায়াটরি সাপলিমেন্ট ও মিষ্টিকারক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহƒত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও বাড়ছে এর চাহিদা।
স্টেভিয়ার বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ক্যালোরিমুক্ত। ফলে যারা ওজন কমাতে চান কিংবা ডায়াবেটিক রোগী, তাদের জন্য এটি দুর্দান্ত বিকল্প। শুধু তা-ই নয় এটি দন্ত্যস্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। বাংলাদেশে স্টেভিয়া গাছ বা বীজ পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে উঠছে। এটি এখন বড় শহরগুলোর নার্সারিতে পাওয়া যায়।