শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
যশোর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও পিচ উঠে ইটের খোয়া বেরিয়ে এসেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বর্ষায় এসব গর্তে পানি ও কাদা জমে থাকছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে দুর্ভোগ বাড়ছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরের এমএম কলেজ রোডের দৈর্ঘ্য এক হাজার ৩৫০ মিটার, বেজপাড়া গয়ারাম রোড ৫০ মিটার, খড়কি পোস্টাল অফিসার্স কোয়ার্টার সংলগ্ন সড়ক ২৯০ মিটার, নতুন খয়েরতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক ১১৫ মিটার, চোরমারা দীঘি এলাকার সড়ক ১৯৫ মিটার ও দুই হাজার ৩২৪ মিটার, সার্কিট হাউসপাড়া রোড ৭৫ মিটার, রায়পাড়া বেলাল মসজিদের সামনে ২৬০ মিটার এবং স্টেডিয়ামপাড়া সড়ক ২৬০ মিটার।
এছাড়া তালতলা বাজার কবরস্থানের পূর্বপাশে ৩২৫ মিটার, পশ্চিমপাশে ১৭০ মিটার, শাহ আব্দুল করিম সড়ক ৯৫ মিটার, গুরুদাস বাবু লেন ৩৫৫ মিটার, রাঙ্গামাটি গ্যারেজ থেকে পন্ডিতপুকুর লেন ৩৪৫ মিটার, চাতালের মোড় এলাকার দুই হাজার ১১২ মিটার এবং আনসার ক্যাম্পের সামনে দুই হাজার ৭০৭ মিটার। এসব দৈর্ঘ্য যোগ করলে তালিকাভুক্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ১১ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার।
তবে, পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের হিসাবে চলমান টেন্ডার বাস্তবায়নের আওতায় সড়কের দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার। ফলে কোন কোন সড়ক বা অংশ প্রকল্পের আওতায় ধরা হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকল্পভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শিকদার মোকলেচুর রহমান বলেন, পৌরসভা ইতিমধ্যে ৯ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার সড়কের ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে টেন্ডার বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি সড়কে কাজ চলমান রয়েছে। এসব সড়কের সঙ্গে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, এলজিইডির নীলগঞ্জ-তাঁতিপাড়া সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় তাঁতিপাড়া ও হুশতলা সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিসি ও আরসিসি ড্রেন এবং সড়কবাতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে নকশার কাজ চলছে। আগামী মাসের মধ্যে খসড়া ডিজাইন পাওয়া যাবে। নথিতে সড়কটির দৈর্ঘ্য ৪৪২ মিটার। চূড়ান্তভাবে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
পৌরসভার চলমান প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ৯ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণে ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি কিলোমিটার সড়কে গড়ে প্রায় দুই কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দাঁড়ায়। একই সঙ্গে ড্রেনের জন্য বরাদ্দ ২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সড়ক ও ড্রেন মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ড্রেনের বরাদ্দ সড়কের বরাদ্দের চেয়েও ২ কোটি টাকা বেশি।
তবে, শহরের সব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এই ৯ দশমিক ৬৫ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কারণ পৌরসভার তালিকায় চাঁচড়া-পালবাড়ি মহাসড়কের ধর্মতলা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের সামনে ১৪১ মিটার এবং পঙ্গু হাসপাতালের আগের বাম হাতের ১৮০ মিটার গলির সড়কও রয়েছে। একই প্রকল্প বা পৃথক প্রকল্পের আওতায় এসব সড়ক ধরা হয়েছে কি না, সেটিও প্রকল্পভিত্তিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়া সড়কের অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের এই সড়কটি খুলনা ও নড়াইল সড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয় যানবাহনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা যানবাহনও এই পথে চলাচল করে। পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকারী যানবাহনের একটি অংশও সড়কটি ব্যবহার করে।
নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গেছে। তৈরি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। কোথাও কোথাও সড়কের মূল কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির পানি গর্তে জমে থাকায় গর্ত আরও গভীর হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যানবাহনও এই পথে চলাচল করে। বড় গর্তে গাড়ি পড়ে মালামাল উল্টে যাচ্ছে। দ্রুত গর্তগুলো ভরাট করে অন্তত সাময়িকভাবে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করা দরকার।
স্থানীয় তরুণ সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক সংস্কারের দাবিতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত কাজ করার আশ্বাস পাওয়া গেলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় কাজ শুরু হলেও নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়া সড়কের কাজ শুরু হয়নি।
খড়কি শাহ আব্দুল করিম সড়কের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু সমান পানি জমে যায়। রাস্তা তলিয়ে যায়। তখন ভাঙা রাস্তায় চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার সড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। শহরবাসী নিয়মিত পৌরসভাকে কর দেন। বিনিময়ে নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী সড়ক পাওয়া তাদের নাগরিক অধিকার।
তিনি আরও বলেন, শুধু উপরের পিচ তুলে নতুন পিচ দিলেই হবে না। সড়কের ভিত্তি, পানি নিষ্কাশন এবং যানবাহনের চাপ বিবেচনা করে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে আগের সংস্কারে ব্যয় হওয়া সরকারি অর্থের হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হাসান বলেন, নীলগঞ্জ-তাঁতিপাড়া সড়কসহ শহরের বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিষয়টি পৌরসভার নজরে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব সড়কের সমস্যা রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শহরের বেশ কয়েকটি সড়কের অবস্থা খারাপ। এসব সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কারের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আনা হবে।