আনোয়ার হোসেন
, মণিরামপুর (যশোর)
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের ১১৭ নম্বর কক্ষ, এনসিডি কর্নার। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয় এই কক্ষে।
উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ জন রোগী এই কর্নারে চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ, দূরদূরান্ত থেকে সময় ও অর্থ ব্যয় করে আসা রোগীরা নিজেরাও জানেন না এই কক্ষে বসে নিয়মিত যিনি রোগী দেখেন, তিনি কোনো চিকিৎসক নন। চিকিৎসক সেজে এখানে রোগী দেখা ব্যক্তি মোস্তাফিজুর রহমান; তিনি একজন কার্ডিওগ্রাফার। যার কাজ রোগীর ইসিজি করা।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে মণিরামপুর হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১১৭ নম্বর কক্ষে ঢুকে দেখা গেছে, চিকিৎসকের চেয়ার ফাঁকা। পাশের চেয়ারে বসে রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছেন কার্ডিওগ্রাফার মোস্তাফিজুর রহমান। তখনও তার সমানে চারজন রোগী টিকিট হাতে অপেক্ষমান। খোঁজ নিতে জানা গেলো, সকাল থেকে তিনি ১২ জন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন।
এ সময় কথা হয় চুহান হোসেন নামে এক রোগীর সাথে। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী এখানে নিয়মিত দেখান। আমি নতুন এসেছি। আমরা ডায়াবেটিসের রোগী। এই কক্ষে চিকিৎসক নেই তা কী করে বুঝবো। সবাই টিকিট দেখিয়ে ওষুধ নিচ্ছেন, আমিও দেখাতে এসেছি।
কহিনুর বেগম নামে এক রোগী বলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত হাসপাতাল থেকে খাই। কয়েকদিন আগে এনসিডি কর্নারে দু’জনে গিয়েছি। মোস্তাফিজুর রহমান নামে ওই ব্যক্তি আমাদের স্লিপ লিখে দিলে তা দেখিয়ে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়েছি।
এনসিডি কর্নারে মোস্তাফিজুর রহমানের রোগী দেখার এই চিত্র নতুন নয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি চিকিৎসক সেজে এখানে নিয়মিত রোগী দেখে আসছেন। শুধু রোগী দেখা নয়, সাপ্তাহিক নির্ধারিত দিনে এই কক্ষে বসে তিনি বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে ফিজিশিয়ান স্যাম্পলও নিয়ে থাকেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন চিকিৎসক ও ৮ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদায়ন রয়েছে। এতো চিকিৎসক থাকতে কেন বহুদিন ধরে মোস্তাফিজুর রহমান নিয়মিত এনসিডি কর্নারে রোগী দেখেন- তা রীতিমত বিস্ময়ের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, মোস্তাফিজের কাজ এনসিডি কর্নারে রোগীর সিরিয়াল লেখা। সেই কাজ ফেলে তার রোগী দেখা কোনোভাবে ঠিক না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্ডিওগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ হলেও হাসপাতালে আগত রোগীদের ইসিজি করান না মোস্তাফিজুর রহমান। হাসপাতালের প্রধানের অনুমতিতে তিনি ১১৭ নম্বর কক্ষে রোগী দেখেন। আর হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সেবিকারা নিয়মিত রোগীর ইসিজি করেন। এমনকী সেবিকারা ব্যস্ত থাকলে আয়াদের মধ্যে কেউ একজন ইসিজির কাজ করেন।
হাসপাতালের তিন তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সেবিকা নাজমা খাতুন বলেন, এখানে রোগীদের প্রয়োজনে আমরা ইসিজির কাজ করি। কার্ডিওগ্রাফার থাকতেও কেন সে একাজ করেন না, তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন বলে তিনি জানান।
রাসেল পারভেজ নামে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা এক রোগী বলেন, এনসিডি কর্নারের অবস্থা দেখে গ্রামের হাঁতুড়ে ডাক্তারদের মতো মনে হচ্ছে। মানুষ অনেক কষ্ট করে দূরদূরান্ত থেকে হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসেন। এখানে এসে নিজের অজান্তে চিকিৎসকের পরিবর্তে কার্ডিওগ্রাফার দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন। এটা তো রোগীর সাথে প্রতারণার শামিল।
কার্ডিওগ্রাফার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি এনসিডি কর্নারে রোগীর ওষুধ লিখে দিই। মাঝেমধ্যে ইসিজি করাই। কার্ডিওগ্রাফার হলেও চিকিৎসা বিষয়ে আমার ৪ বছরের ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট আছে। হাসপাতাল প্রধানের আদেশে আমি এখানে বসি।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাইয়াজ আহমদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেননি।
ডা. ফাইয়াজ বলেন, মোস্তাফিজুর রহমানের নিয়োগ কার্ডিওগ্রাফার হলেও তিনি মেডিসিনে চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। কক্ষের স্বল্পতায় তাকে এনসিডি কর্নারে রোগীদের নাম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ডায়াবেটিস রোগীদের বই দেখে ওষুধ লিখে দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোস্তাফিজুর রহমানকে এনসিডি কর্নার থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও দেওয়ার বিষয়টি কয়েকদিন ধরে ভাবছি।