যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সবচেয়ে দামি রাজা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
সবচেয়ে দামি রাজা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘গোলাম-চোর’ তাস ও জুয়াড়ি-মনন সম্পর্কে দার্শনিক বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে: ‘অদৃষ্ট আমাদের জীবনের তাসে অনেকগুলির মিল রাখিয়াছেন, কিন্তু মাঝে মাঝে একটা একটা করিয়া গোলাম রাখিয়া দিয়াছেন, তাহার আর মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। চিরজন্ম গোলাম-চোর খেলিয়া আসিতেছি, কত বাজি যে খেলা হইল তাহার আর সংখ্যা নাই, খেলোয়াড়দের মধ্যে কে জাঁক করিয়া বলিতে পারে যে, সে একবারও গোলাম-চোর হয় নাই? অদৃষ্টের হাতে নাকি তাস, আমরা দেখিয়া টানিতে পারি না, তাহা ছাড়া অদৃষ্টের তাস খেলায় নাকি গোলামের সংখ্যা একটি নহে, এমন অসংখ্য গোলাম আছে কাজেই সকলকেই প্রায় গোলাম-চোর হইতে হয়। আমরা সকলেই চাই, মিলকে পাইতে ও অমিলকে তাড়াইতে। গোলাম পাইলে আমরা কোনো উপায়ে গলাবাজি করিয়া চালাকি করিয়া প্রতিবেশীর হাতে চালান করিয়া দিতে চাই। মেধা, হিসাব আর পর্যবেক্ষণ শক্তির যোগফলেই ভালো তাস খেলা সম্ভব। অনেকের কাছেই এ তাস খেলা প্রিয় হলেও জুয়াড়িদের কাছে এটি যেন প্রাণ।’

তাস খেলা না জানলেও ইস্কাপন, হরতন, রুইতন, চিরতন নামগুলো কম-বেশি সবার কাছেই পরিচিত। আন্তর্জাতিকভাবে এগুলো ডায়মন্ডস, স্পেডস, হার্টস, ক্লাবস নামে পরিচিত।

তাসের চারটি প্রতীক এখনও পঞ্চদশ শতকের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির পরিচয় বহন করে চলেছে। আবার তাসের ছবিগুলোতে উপস্থাপিত হয়েছে ঐতিহাসিক নানা ব্যক্তিত্ব।

প্রথম দিকে তাসের প্যাকেটে ৭৮টি তাস থাকতো। কিন্তু এতগুলো তাস নিয়ে খেলা জটিল ও কষ্টকর হয়ে ওঠায় তাসের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। তবে হ্রাসকৃত সংখ্যার মধ্যে যে তাসটি এখনো সগৌরবে টিকে আছে সেটি হলো জোকার। খেলুড়েদের কাছে এই তাসটি সুপার ট্রাম্প কার্ড হিসেবে পরিচিত।

প্রধান চারটি তাসের মধ্যে ডায়মন্ডস হলো ধনী শ্রেণির প্রতীক। স্পেডসের প্রতীক হলো সৈন্য। ‘স্পেড’ শব্দটি এসেছে স্পেনিশ ‘স্পাডা’ থেকে। এটার অর্থ তরবারি। হার্টস পাদ্রিদের প্রতীক। আগে প্রতীকটির আকার ছিল পান পাতার মতো। পরে ওটা হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের আকার পায়। ক্লাবস বলতে বোঝানো হতো গরিব মানুষদের। ইংরেজি ক্লাবের বাংলা হলো মুগুর। গরিব শ্রেণির মানুষের মুগুরই সম্বল—এরকম একটা অর্থ বহন করে এই তাসটি।

তাসের গায়ের ছবিগুলোরও রয়েছে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা। কিং অব ডায়মন্ডস হলেন জুলিয়াস সিজার এবং তার স্ত্রী র‌্যাচেল। কিং অব স্পেডস হলেন ডেভিড, গোলিয়াথের হত্যাকারী। এই তাসের রানি হলেন গ্রিক যুদ্ধদেবী প্যালাস, যিনি দুই হাতে ধরে আছেন তরবারি ও ফুল। কিং অব হার্টস-এর ছবি আঁকা হয়েছে বিখ্যাত রাজা শার্লেমেনের অনুকরণে, যিনি ৮০০ খ্রিস্টাব্দে জয় করেন অর্ধেক ইউরোপ। তার তাসের রানি হলেন বাইবেল-বর্ণিত নায়িকা জুডিথ। যিনি রাজার তরবারির এক আঘাতে এক আসিরিয়ান সেনাপতিকে হত্যা করেছিলেন।

অন্যদিকে কিং অব ক্লাবস হলেন দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার, যিনি ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বে পৃথিবীর প্রায় পুরোটা দখল করে নিয়েছিলেন। আগের তাসে পৃথিবীর মানচিত্রের গোলক থাকতো, পরে তার আলখেল্লায় গোলকটি আঁকা হয়। কুইন অব ক্লাবস হলেন একমাত্র ইংরেজ মহিলা, যিনি আর কেউ নন রানি প্রথম এলিজাবেথ। তার গোলাম হলেন রাউন্ড টেবিলের বিখ্যাত নাইট, স্যার ল্যান্স লট।

বিশ্বে প্রথম তাস খেলার প্রচলন ঘটে চীনে। খ্রিস্টীয় নবম শতকের দিকে টাং রাজার রাজত্বকালে অন্তঃপুরবাসী রানিরা তাস খেলে সময় কাটাতেন। তখন খেলার কার্ড হিসেবে পয়সা ও প্লেট ব্যবহার করা হতো। এ খেলা দ্রুত ভারতবর্ষেও তখন ছড়িয়ে পড়ে এবং খেলার কার্ড হিসেবে তখন রিং, তলোয়ার, কাপ ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো।

তবে ৫২ কার্ডের খেলা প্রচলন করে প্রাচীন মিসর। তারা এই কার্ড চারজন মিলে খেলতো। অর্থাৎ বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চারজন মিলে যেভাবে তাস খেলা হয়, সেটা মিসর উদ্ভাবন করেছিল খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে। আর ঊনবিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এই খেলা রাজপরিবার এবং সৈন্য-সামন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ফ্রান্সের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কার্ডের নামেও আসে পরিবর্তন। ক্ষমতানুযায়ী কার্ডের নাম দেওয়া হয় রাজা-রানি, জোকার ইত্যাদি। বর্তমানে এই খেলা এত বেশি জনপ্রিয় যে, তা মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারেও ঢুকে গেছে। একাকিত্ব কাটানোর ভালো উপায় হিসেবে এটা নাকি করা হয়েছে।

সাধারণত তাসের উভয় পিঠ মসৃণ হয়। তবে অন্ধদের তৈরি ব্রেইল পদ্ধতির কার্ড মসৃণ নয়। আবার বর্তমানে অধিকাংশ তাসের বাইরের পিঠ বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তাস খুব প্রাচীন খেলা নয়। নবম শতকে চীনা ট্যাং রাজবংশের আমলে তাসের প্রচলন শুরু হয়। এগারো শতকে এটা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। চীনে এটা মানিকার্ড নামে পরিচিত ছিল। রাজপরিবারের মেয়েরা এটা খেলতো।

চৌদ্দ শতকের শেষ ভাগে এটা ইউরাপে ছড়িয়ে পড়ে মুসলমানদের হাত ধরে। ধারণা করা হয়, মিসরের মামলুক শাসকদের আমলে তাস প্রথম স্পেনে যায়। মামলুকদের চার ধরনের তাসে ছিল পলো খেলার লাঠি, মুদ্রা, তলোয়ার ও পেয়ালা। ১৯৩৯ সালে ইস্তান্বুলের টপকাপি রাজপ্রাসাদে মামলুক আমলের একটি পরিপূর্ণ সেট আবিষ্কৃত হয়।

১৫ শতকে ফ্রান্সে কাঠের খোদাই করা তাস চালু হয়। তবে স্পেনে মুর মুসলিম শাসনামলে চৌদ্দশ’ সালের শুরুতেই ছাপানো তাস চালু হয়ে যায়।

বর্তমানে স্পেডস, হার্টস, ডায়মন্ডস আর ক্লাবস নামে তাস বিশ্বজুড়ে চালু হয়ে যাওয়ার কারণে তাসের প্রাচ্য ঐতিহ্য চাপা পড়ে যায়।

জন্ম থেকেই তাসের সবচেয়ে দামি কার্ড ছিল রাজা। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব কিছু সময়ের জন্য সব কিছু ওলট-পালট করে দেয়। সবচেয়ে কম দামি টেক্কাই শীর্ষে উঠে আসে। শুধু তাই নয়, তাসের রাজা, রানি আর গোলাম হয়ে যায় যথাক্রমে লিবার্টিস (স্বাধীনতা), ইউটিলিটিস (সাম্য) ও ফ্রেটারনিটি (ভ্রাতৃত্ব)। কিন্তু ১৮০৫ সালে নেপোলিয়নের উত্থানের পর আবার নির্বাসিত রাজা-রানি-গোলাম ফিরে আসে।

আবার ৫২ তাসের প্রতিটিরই রয়েছে স্থান-কাল-পাত্রভেদে আলাদা আলাদা ডাকনাম। যেমন টেক্কা বিশ্বের অঞ্চলভেদে ব্ল্যাকবেরি, বুল, বুলেট, ডেথকার্ড, আইস, মাস্টারকার্ড, ওয়ানস্টপ পিগস আই, পাপি, ফুট, রকেট, শার্পটপ, কাউবয়, কে-বয়, নাইট, মনার্ক, সার্জেন্ট নামে পরিচিত।

দি ইন্টারন্যাশনাল প্লেয়িং কার্ড জার্নালে প্রতিটি কার্ডের উপনাম বা ডকনামগুলোর বিশদ ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মরণে প্রতিটি ছবিযুক্ত ও ছবি ছাড়া তাসের আলাদা আলাদা নামকরণে ফ্রেঞ্চরা সম্ভবত সবচেয়ে এগিয়ে। তবে নামকরণ সবসময় এক ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি। সাধারণভাবে স্পেডস বা ইস্কাপনের রাজা কিং ডেভিড, ক্লাবস বা চিরতনের রাজা আলেকজান্ডার, হার্টস বা হরতনের রাজা শার্লেমেন এবং ডায়মন্ডস বা রুইতনের রাজা জুলিয়াস সিজারকে মেনে নেওয়া হলেও এক সময় ফ্রান্সে তাসের চার রাজা ছিলেন যথাক্রমে বাদশা সলোমন, অগাস্টাস, ক্লভিস এবং কনস্টান্টাইন। কিন্তু সম্রাট চতুর্থ হেনরির আমলে শার্লেমেন (রুইতন), কিং ডেভিড (ইস্কাপন), সিজার (রুইতন) এবং আলেকজান্ডারকে (চিরতন) রাজা ঘোষণা করা হয়।

অন্যদিকে রানির সম্মান পান জুডিথ (হরতন), পেলাস (ইস্কাপন), র‌্যাচেল (চিরতন) এবং আরগিন (রুইতন)। ইউরোপের দেশগুলো তাদের নিজ নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাসের চার রাজাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে উপস্থাপন করে।

সাধারণভাবে চার প্রকার তাসের মধ্যে চারটি শীর্ষ তাস হচ্ছে টেক্কা, রাজা, রানি ও গোলাম। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা টুয়েন্টি নাইনে সর্বোচ্চ র‌্যাংকের কার্ড হচ্ছে গোলাম।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম দি ইউনাইটেড স্টেটস প্লেয়িং কার্ড কোম্পানি (ইউএসপিসি)। ১৮৬৭ সালে অহিও অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি বছরে দশ কোটি সেট তাস উৎপাদন করে। এরিস্ট্রোক্রেট, এভিয়েটর, বি, বাইসাইকেল ও হলিব্যান্ডের তাস এরাই বানায়। জনপ্রিয় ব্রান্ডের নামেও তারা তাস তৈরি করে। যেমন, কোকাকোলা মিকিমাউস, হ্যারিপটার, পটেটো হেড ইত্যাদি।

তাস নিয়ে ভবন তৈরি করাও কারো কারো কাছে বিনোদনের শামিল। এটা কার্ডস্টেকিং নামে পরিচিত। ১৯৯২ সালে আমেরিকার আইওয়া রাজ্যের ব্রায়ানবার্গ নামের একজন স্থপতি চব্বিশ শত কার্ডের সাহায্যে ২৫ ফুট ৩.৫ ইঞ্চি উঁচু ভবন তৈরি করে গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম লেখান।

তাস যুদ্ধবন্দীদের পালাতেও সহায়তা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মানদের হাতে বন্দী আমেরিকান সৈন্যদের কাছে বিশেষ ধরনের কার্ড পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল মিত্র বাহিনী। ইউএসপিসি মার্কিন সরকারের সহায়তায় এই কার্ড তৈরি করে দেয়। এই তাস ভিজিয়ে সহজেই দুই ভাগে ভাগ করা যেত। এতে ছিল জার্মান বন্দিশিবির থেকে পালানোর মানচিত্র। অধিকাংশ বন্দী এই বিশেষ কার্ডের ম্যাপ অনুসরণ কর পালাতে পেরেছিল।

আবার যুদ্ধে প্রতিপক্ষের মনে ত্রাস ধরিয়ে দিতেও ভূমিকা রেখেছে তাস। ১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যরা জঙ্গলে হাজার হাজার প্যাকেট বিশেষ কার্ড ছড়িয়ে রাখে। কার্ডের প্যাকেটে থাকতো শুধু ইস্কাপনের টেক্কা। ফ্রেঞ্চ ট্যারট কার্ড অনুযায়ী ইস্কাপনের টেক্কা মৃত্যু বিবেচিত হয়। ভিয়েতকং সৈন্যদের মাঝে এই কুসংস্কার সক্রিয় ছিল। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্যরা বাড়তি ফায়দা লুটতে পেরেছিল।

জে ই সিরলট তার ‘অ্যা ডিক্সনার অব সিম্বলস’-এ দাবি করেছেন, ফ্রেঞ্চ ট্যারট কার্ড অনুসরণে ইউরোপে তাসের উৎপত্তি হয়েছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই, বরং তাস আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রাচ্য থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার অপকৌশল মাত্র।

ক্রীড়া ও তাসের মাঝে প্রভেদ কোথায়?—এই প্রশ্ন বার বার উচ্চারিত হয়। জুয়াড়িরা জোর গলায় বলেন, ক্রীড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। তাই তাস ক্রীড়া বিবেচিত হতে বাধ্য। কিন্তু এটা নেহায়েত খেলো যুক্তি। কারণ পানি ও হুইস্কি পানযোগ্য হলেও দুটো এক জিনিস নয়। আসলে তাস যে সম্মানজনক ও রুচিশীল খেলা নয়, তা নানাভাবে বেঝানোর চেষ্টা হয়েছে যুগে যুগে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)