স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
হিমালয় ছেড়ে চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অসুরবিনাশিনী দেবী দুর্গার মর্ত্যে পদার্পণের মধ্য দিয়ে শুক্রবার মহাষষ্ঠী তিথিতে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে।
‘রূপং দেহি, যশো দেহি, জয়ং দেহি, দ্বিষো জহি’ মন্ত্রে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশের প্রতিটি মন্দির ও মণ্ডপ।
পঞ্জিকামতে, দেবীপক্ষের পঞ্চমী তিথি পেরিয়ে শুক্রবার শুরু হয়েছে মহাষষ্ঠী।
নানা ধর্মীয় ও মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সূর্যোদয়ের পর কল্পারম্ভ ও বোধনের মাধ্যমে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বোধনের অর্থ হলো জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্তি।
সন্ধ্যায় ধূপের সুবাস, পঞ্চপ্রদীপের আলো, ঢাক-কাঁসরের বাদ্য এবং শঙ্খ ও উলুধ্বনির যুগলবন্দীতে দেবীর বোধন ও ঘট স্থাপন সম্পন্ন হবে। এরপর রোববার সকালে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভে দেবীর আমন্ত্রণ, অধিবাস ও মূল পূজা শুরু হবে।
এদিকে, পূজার আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে ভক্তদের মনে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পূজার দিনগুলোতে বৃষ্টি হতে। তবে সব বাধা পেরিয়ে নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপনে প্রার্থনা করছেন সর্বস্তরের সনাতনিরা।

এবারের দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে যশোর শহরের লালদীঘির পূর্বপাড়ে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পূজা পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন ও সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষসহ অন্যরা।
জানানো হয়, এ বছর জেলার আটটি উপজেলায় গত বছরের চেয়ে ৩৩টি বেড়ে মোট ৭৪১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭০টি, অভয়নগরে ১৩২, মণিরামপুরে ১০৩, কেশবপুরে ১০১, বাঘারপাড়ায় ৯২, ঝিকরগাছায় ৫৯, চৌগাছায় ৫৩ এবং শার্শায় ৩১টি মণ্ডপ রয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে জেলায় ৭৩৩টি, ২০২৪ সালে ৬৫২টি এবং ২০২৫ সালে ৭০৮টি মণ্ডপে পূজা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
যশোর রামকৃষ্ণ আশ্রম সূত্রে জানা গেছে, ১৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টায় ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভে দেবীর বোধন এবং বিকেল ৫টায় পূজা শুরু হয়। ১৭ অক্টোবর সকাল ৫টায় মহাষষ্ঠীর বিহিত পূজা এবং সায়ংকালে আমন্ত্রণ ও অধিবাস। ১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৫টায় মহাসপ্তমী পূজা। ১৯ অক্টোবর সকাল ৫টায় মহাঅষ্টমী পূজা, সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা এবং সকাল ১০টা ৫৮ মিনিট থেকে বেলা ১১টা ৪৬ মিনিটের মধ্যে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হবে। এছাড়া ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর সকাল ৬টায় দশমী পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা সমস্ত অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক। এ বছর দেবীর আগমন ঘটছে ঘোটকে (ঘোড়ায়); যা ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’ অর্থাৎ অগোছালো ও অশুভ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। তবে দেবী কৈলাসে প্রস্থান করবেন নৌকায়, যার ফল হিসেবে ‘নৌকায়াং শস্যবৃদ্ধি জলবৃদ্ধিশ্চ’ অর্থাৎ, সমৃদ্ধি, সুবৃষ্টি ও শস্যপূর্ণ পৃথিবীর শুভবার্তা পাওয়া যায়।
যশোর রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ মহারাজ জানান, গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেবী দুর্গার সঙ্গে অসুর যেমন সর্বদাই যুদ্ধে লিপ্ত, তেমনই মানবের দৈব সত্তা ও মনুষ্যত্ববোধের সঙ্গে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য- এই ছয় আসুরিক রিপুর লড়াই চলছে। মহাশক্তি জগন্মাতার শরণাগত হলে এসব রিপু থেকে মুক্তিলাভ করে মানুষের ভেতর দৈবী সত্তার জাগরণ ঘটে।’
তিনি সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।