মেহেরপুর প্রতিনিধি
কাঠফাটা রোদ, তীব্র তাপদাহ কিংবা প্রকৃতির কোনো প্রতিকূলতাই থামাতে পারছে না মেহেরপুরের নারী শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম। জেলার কৃষিজমি, ইটভাটা কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে দিনশেষে পাওনার হিসেবে বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এই নারীরা। পুরুষদের সমান কাজ করেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাঁদের এই লড়াই এখন এক 'নীরব সংগ্রামে' পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কোদাল, ডালি বা হাতুড়ি হাতে পুরুষ শ্রমিকদের মতোই কঠোর পরিশ্রম করছেন নারীরা। এদের অধিকাংশই বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা বয়স্ক নারী, যাদের সংসারের চাকা সচল রাখতে এই কঠিন শ্রমই একমাত্র অবলম্বন।
গাংনী উপজেলার কসবা গ্রামের রেনুকা দাস, রহিমা বিবি, সামিরন নেছা ও জরিনা খাতুনের মতো অনেক নারী দলবেঁধে কাজ করছেন মাঠ আর ইটভাটায়। দিনে প্রায় আট ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৩৫০ টাকা, যেখানে একই কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী রেনুকা দাস আক্ষেপ করে বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরুষদের মতোই কাজ করি, কিন্তু মজুরি পাই প্রায় অর্ধেক। এই সামান্য টাকায় এখনকার বাজারে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।” স্বামী পরিত্যক্তা রহিমা বিবি জানান, পুরো পরিবারের দায়ভার তাঁর ওপর থাকলেও সমান কাজ করেও ন্যায্য টাকা পান না তিনি।
আর বয়সের ভারে ন্যুব্জ সামিরন নেছার আক্ষেপ, শরীর না চললেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয়, কিন্তু দিনশেষে কম মজুরি পাওয়াটা খুব কষ্টের। প্রতিবাদ করতে চাইলেও কাজ হারানোর ভয়ে মুখ খোলেন না জরিনা খাতুনের মতো শ্রমিকরা।
এই বৈষম্য নিয়ে স্থানীয় নারী নেত্রী ফরিদা পারভীন বলেন, নারীরা দক্ষতায় পিছিয়ে নেই, তবুও তারা মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। এই বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।
এ প্রসঙ্গে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসিমা খাতুন জানান, নারীদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। তিনি আশা করেন, সরকারি উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান আরও সুসংহত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে মেহেরপুরের এই নারী শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসান ঘটবে, যা জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।