এনসিপির কনভেনশনে বিশেষজ্ঞরা
সুবর্ণভূমি ডেস্ক
দেশের অর্থনীতিতে চলমান স্থবিরতা কাটাতে সুনির্দিষ্ট সংস্কার এবং শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে এবং গত আমলের অলিগার্কিক ব্যবস্থা ভাঙতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে ঐক্যমত পোষণ করা হয়।
রোববার (৩ মে) ঢাকার কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি দিনব্যাপী ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করে। চারটি সেশনে কনভেনশনে বিভিন্ন বিষয়ে আমন্ত্রিত বক্তারা তাদের নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন। দিনের শুরুতে প্রথম সেশনে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: দুদক, এনবিআর, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থান’ শীর্ষক সেশনটি পরিচালনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহবায়ক জাবেদ রাসিন। এতে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
বিডিজবস এর সিইও ফাহিম মাসরুর বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশে সামগ্রিক বেকারত্ব ৪-৫ শতাংশের নিচে হলেও ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার তিন থেকে চার গুণ বেশি। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের ৫০ শতাংশের বেশি বর্তমানে কর্মহীন। গত ১০-১৫ বছরে পরিকল্পিতভাবে উপজেলা পর্যায়ে যত্রতত্র কলেজ খোলার মাধ্যমে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যাদের বড় অংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। বর্তমান উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকটে নতুন বিনিয়োগের অভাব থাকায় এই শিক্ষিত তরুণদের জন্য দেশে দ্রুত চাকরি তৈরি করা কঠিন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে বহুমাত্রিক অভিহিত করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাব, রাজস্ব খাতের বিশৃঙ্খলা এবং অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা এই চারটি অভ্যন্তরীণ কারণের সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন যুক্ত হয়ে সংকটকে ঘনীভূত করেছে। অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, জনতা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ ঋণই এখন অকেজো। ফ্যাসিবাদের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে যে অলিগার্কিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। তবে বর্তমান সরকারের কিছু কৌশলী সিদ্ধান্তের ফলে আবারও লুটেরাদের হাতে মালিকানা ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ জানান, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মূলধন সংকটে ভুগছেন।
ভুল নীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
দীর্ঘদিন ধরে ভুল নীতি, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। ‘জ্বালানি নিরাপত্তা: বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যত করণীয়’ শীর্ষক দ্বিতীয় সেশনে এমন মতামত দিয়েছেন বক্তারা। এ সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু এবং সঞ্চালনা করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন।
ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি এই দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশে বর্তমানে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৮০ শতাংশের বেশি, যা আরও বাড়তে পারে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি সংকট মূলত নীতিগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ফল। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে, যা জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি খাতে ভুল নীতি ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ দুর্নীতি ও ভুল নীতি কাঠামো। জ্বালানি খাতে বিপুল আমদানি ব্যয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেটকে প্রভাবিত করছে। আর এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে উচ্চ ব্যয় দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
ভিন্নমতেরও ন্যূনতম অধিকার প্রাপ্য
মানবাধিকার একটি সার্বজনীন বিষয়। যারা ভিন্ন মতাদর্শ লালন করেন, তাদেরও এটি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাদের ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের সমালোচনা করার কারণে গ্রেপ্তার করা, জামিন না দিয়ে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে। ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক তৃতীয় সেশনটিতে বক্তারা এ কথা বলেছেন। সেশনটি সভাপতিত্ব করবেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ এবং সঞ্চালনা করবেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কেবল আমার দল ও মতাদর্শের মানুষের জন্য নয়। বরং এটি সবার জন্য হতে হবে। ভিন্ন মতাদর্শের যারা রয়েছেন, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, জামিনই পাওয়া যাচ্ছে না। বিচারককে দশবার ভাবতে হয়, সে আসলে জামিন দেবে কী না। আমরাও চাই, জুলাইয়ের হত্যাকণ্ডের বিচার সঠিকভাবে হোক। কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না এবং অনেককেই প্রমাণিত হওয়া ছাড়া আটক রাখা হচ্ছে।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এই সরকারের সময়ে ২২ দিনে ৫ জনকে সরকারে বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য আটকের ঘটনা দেখেছি। অনেকে মনে করেন, আটকের পর জামিন দিলেই বোধহয় শেষ। আসলে এটি হয়রানির শুরু। বর্তমান সরকার অতীতের মতো করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, আগে মতপ্রকাশের কারণে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, সাইবার সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার না করে সরাসরি মানহানির মামলা করছে। এখন বিচারকরা ভয়ে থাকেন, জামিন দেয়ার কারণে তিনি কোনো রোষানলে পড়েন।
সংস্কারের পক্ষে ভোট চেয়ে বাস্তবায়ন না করাই অন্তহীন প্রতারণা
সংস্কারের পক্ষে ভোট চেয়ে এখন তা বাস্তবায়ন না করাই মূলত অন্তহীন প্রতারণা। যেসব নাগরিক গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তার প্রতিফলন না দেখলে তারা চুপ করে বসে থাকবে না। তারা রাজপথে নেমে আসবে। ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে জুলাই সনদ, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক সর্বশেষ সেশনটিতে এমনটাই মন্তব্য করেছেন বক্তারা। সেশনটি সভাপতিত্ব করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলেছি। সংশোধনের মাধ্যমে এটা টেকসই হবে না। বিএনপি সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন করতে চাইলে সেটি টেকসই হবে না, যেকোনো সময় এটা বাতিল হতে পারে। আমি সংসদে বলেছি, জিয়াউর রহমান এই ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন। ফলে বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতার নামে আওয়ামীলীগের আদর্শ এবং রাজনীতি ফিরিয়ে আনার দরজা খোলা রাখা হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান তার কবর রচনা করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু নির্বাচনের পরে দেখলাম তারা জনগণের সাথে প্রচারণা করছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ বুঝে ফেলেছে, সরকার দলের ঘাড়ে ভূত চেপেছে। তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। সংসদে তারা ঐক্যমত্য কমিশনের বই হাতে নিয়ে বলে, আমরা এই জুলাই সনদের সব অক্ষরে অক্ষরে মানব। কিন্তু কোনোদিন তারা বলে না, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে মানব।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির জায়গা থেকে যখন বলা হয়, নির্বাচন আদায়ের জন্য আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম, আসলে সংস্কারের কোনো ইছে ছিল না এবং অন্যরা যখন সেখানে সায় দেয়। এটা তো আত্মস্বীকৃত মুনাফেকি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, হিটলারকে নিয়ে গবেষণা হয়েছিল যে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন জনপ্রিয় শাসক কিভাবে স্বৈরাচারী হয়ে যান। তখন দেখা যায়, হিটলারের সময়ে আর্থিক সংকটে রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, তখন সে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে স্বৈরতান্ত্রিক হতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে চোখ বন্ধ করেই আমি বলতে পারি, অবধারিতভাবে আগামী তিন বছরের মধ্যে বিএনপি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।