সম্পাদকীয়
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বাংলাদেশের শহর-নগরাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখন শুধু মহামারি আকারে ছড়িয়ে হাজারো মানুষকে যন্ত্রণা আর মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দেয়। বিশেষত যশোরের সদর ও অভয়নগরের মতো হটস্পটগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যদি না সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সচেতন হয়।
এ বছর আগাম বৃষ্টি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আনতে পারে আগেভাগেই। অভয়নগরে ইতিমধ্যে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য বিভাগ আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে- এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; ডেঙ্গু নির্মূলে দরকার জনসাধারণের সচেতনতা ও পৌর কর্তৃপক্ষের বিস্তৃত তৎপরতা।
টব, ফ্রিজের ট্রে, ডাবের খোসা বা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননস্থল। শহরাঞ্চলে এসবের উপস্থিতি বেশি। ফলে নগর-শহরে ডেঙ্গুর বিস্তারও বেশি। কিন্তু গ্রামাঞ্চলেও যে ডেঙ্গু বাড়ছে, তাও উপেক্ষণীয় নয়। ফলে প্রাথমিক সচেতনতা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। প্রত্যেক বাড়িতে এই বিষয়ে অবহিত থাকা মানুষের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
পৌর কর্তৃপক্ষ মশক নিধনে যে ওষুধ স্প্রে করে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার রাসায়নিক ওষুধ স্প্রে করার ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। সে কারণে প্রতিরোধমূলক অন্য ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া সবার জন্যই উপকারী। এক্ষেত্রে পৌর কর্তৃপক্ষ ফেলে দেওয়া টায়ার, ডাবের খোসা বা নানা ধরনের পাত্র অপসারণে এই মওসুমে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে পারে। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবনের নিচে জমে থাকা পানি অপসারণ নিশ্চিত করা, স্কুল, কলেজ ও মসজিদ-মন্দিরের মাইকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারও তাদের জন্য অনেক কঠিন কাজ নয়।
পাশাপাশি, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ, স্যালাইন ও প্লাটিলেট নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব।
নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পূর্ণ পোশাক পরিধান, মশারি ব্যবহার, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য জ্বরে আক্রান্ত হলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে একক বা স্বাস্থ্য বিভাগ বা স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এটিকে মোকাবেলা করতে হবে সম্মিলিতভাবে। গ্রাম থেকে শহর, বাড়ি থেকে অফিস, প্রতিটি স্তরে সচেতনতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে এই কঠিন রোগের হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারি, রক্ষা করতে পারি শিশুদের। সময় এখনই কাজ করার, নয়তো আরও অনেক মূল্যবান প্রাণ হারানোর শঙ্কা বাড়বে।