তসলিম শিমুল
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর কোটি মানুষের এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার গল্প। বিশ্বকাপের মৌসুম এলেই আমাদের দেশের অলিগলি, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে শুরু হয় প্রিয় দলকে ঘিরে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে বিশ্বকাপ দেখার মাধ্যম, পাল্টেছে দর্শকদের অভ্যাস এবং উন্মাদনার প্রকাশভঙ্গি। ৯০-এর দশকের বিশ্বকাপ আর বর্তমান সময়ের বিশ্বকাপের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য, যদিও ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আজও একই রকম অটুট।
৯০-এর দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিল সীমিত। অধিকাংশ পরিবারের কাছে টেলিভিশন ছিল না। তখন বিটিভিই ছিল খেলা দেখার প্রধান এবং অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র মাধ্যম। বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ থাকলে এলাকার এক বা দুইটি বাড়িতে মানুষ জড়ো হতো। ছোট্ট একটি সাদা-কালো কিংবা রঙিন টেলিভিশনের সামনে গাদাগাদি করে বসে খেলা দেখার দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত।
সেই সময়ে খেলা দেখার আনন্দ ছিল অনেক বেশি সামাজিক। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ভয় ছিল, অ্যান্টেনা ঠিক করার ঝামেলা ছিল, সম্প্রচারের মানও সবসময় ভালো থাকতো না। তবুও দর্শকদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়তো না। বরং এসব সীমাবদ্ধতাই যেন আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতো।
১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি ও জার্মানির সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলতো দিনের পর দিন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও বিশ্লেষণই ছিল তথ্য জানার প্রধান উৎস। ম্যাচের ফলাফল নিয়ে পরদিন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ ও অফিসে চলতো প্রাণবন্ত আলোচনা।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ে বিশ্বকাপ দেখার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রযুক্তির উন্নয়নে এখন খেলা দেখার জন্য টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হয় না। স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মুহূর্তেই খেলা দেখা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ম্যাচ চলাকালীন সময়েই দর্শকরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন।
এখন বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের হাতের মুঠোয়। খেলোয়াড়দের অনুশীলন, সংবাদ সম্মেলন, পরিসংখ্যান, বিশ্লেষণ- সবকিছুই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাওয়া যায়। ফলে দর্শকদের তথ্যপ্রাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।
তবে অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার কারণে সেই পুরনো দিনের সম্মিলিত সামাজিক আনন্দ কিছুটা কমে গেছে। আগে একটি ম্যাচ দেখার জন্য পুরো পাড়া একত্র হতো, এখন অনেকেই একা একা মোবাইল ফোনে খেলা দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা বাড়লেও মুখোমুখি আড্ডা ও পারস্পরিক যোগাযোগ আগের তুলনায় কমেছে।
তবুও বিশ্বকাপের আবেগে কোনো ঘাটতি নেই। এখনও দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রিয় দলের পতাকা উড়তে দেখা যায়। বাড়ির ছাদ, রাস্তার মোড় কিংবা মাঠজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আজও বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বিশ্বকাপ দেখার মাধ্যমও বদলেছে; কিন্তু ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বদলায়নি। ৯০-এর দশকের বিটিভির সামনে বসে খেলা দেখার স্মৃতি যেমন অমূল্য, তেমনি বর্তমান সময়ের ডিজিটাল যুগও বিশ্বকাপকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল তাই শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এক সুতোয় গাঁথার এক অনন্য উৎসব। পুরনো দিনের নস্টালজিয়া আর আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপও কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে নতুন আনন্দের গল্প লিখবে- এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: ক্রীড়ালেখক