সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর রামিসা শিশু হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১৭ দিনে, কার্যদিবস হিসেবে যা মাত্র ছয় দিন। দেশের বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ, যারা বছরের পর বছর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য প্রহর গুনছেন, এই দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে তাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সক্ষমতার প্রমাণ রাখতে পারলে যে কোনো জটিল মামলাই দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব- একথা প্রমাণিত হয়েছে বলেও কেউ যদি ভাবেন, তো তাকে দোষ দেওয়া যাবে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দ্রুত রায় নিষ্পত্তি কি প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের সব শর্ত পূরণ করে হয়েছে? নাকি জনরোষ ও চাপের মুখে তড়িঘড়ি করে ফাঁসি কার্যকরের পথে হাঁটা হয়েছে? মাত্র ছয় কার্যদিবসে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ, বাদী-বিবাদীর বক্তব্য ও আইনি জটিলতা নিরসন করা আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভেবে দেখার বিষয়।
মামলাটির নথি উচ্চ আদালতে গেলে সেখানে প্রক্রিয়াগত কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে এই দ্রুত রায়ের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। তাহলে তখন বিচারবিভাগীয় দক্ষতা নয়, বরং তাড়াহুড়ো করেই অভিযুক্তদের ‘শাস্তি’ দেওয়ার মানসিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এছাড়া এমন প্রশ্ন করা অসঙ্গত হবে না যে, যদি এতো দ্রুত বিচার সম্ভব হয়, তাহলে কেন দেশের অন্যান্য লক্ষাধিক মামলা যুগের পর যুগ ঝুলে থাকে? জনবল সংকট থাকার কথা আমরা সবসময় শুনে আসছি। কিন্তু জনবল পূরণের কোনো উদ্যোগ তো দৃশ্যমান হয় না।
সুতরাং রামিসা মামলার রায় যথাযথ প্রক্রিয়া ও ন্যায়সঙ্গত হলে তা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। কিন্তু এর মাধ্যমে যদি আইনি প্রক্রিয়া প্রশ্ন কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য মোটেই ভালো হবে না। দ্রুত বিচার আমরা চাই, তবে যেন ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রকৃত অপরাধী যেন শাস্তি পায় এবং বিচারপ্রক্রিয়া যেন হয় স্বচ্ছ, যুক্তিনির্ভর ও সর্বোপরি মানবিক হয়। মনে রাখা দরকার, শুধু ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই হবে না, তা দৃশ্যমানও হতে হবে।