খুলনা প্রতিনিধি
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং খুলনার চার সাংবাদিকের উপর গুলিবর্ষণকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার নেতৃবৃন্দ খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হারুন এর মাধ্যমে এ স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপি গ্রহণ করে মন্ত্রী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
স্মারকলিপিতে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো -অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে; হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং খুলনা মহানগরীতে কর্মরত সকল সাংবাদিকের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, খুলনা সংবাদপত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিল্টন, খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সদস্য সচিব রফিউল ইসলাম টুটুল, এমইউজে খুলনার সভাপতি রাশিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি নূরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রানা, সহ-সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম নূর, কোষাধ্যক্ষ রকিবুল ইসলাম মতি, নির্বাহী সদস্য কে এম জিয়াউস সাদাত, বিএফইউজের সাবেক নির্বাহী সদস্য ও এমইউজে খুলনার সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আলাউদ্দিন, সাংবাদিকনেতা আহমদ মুসা রঞ্জু, ফটো সাংবাদিক সেলিম গাজী, মাসুম বিল্লাহ ইমরান, তানভীর ইসলাম প্রান্ত, শাহ আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে দেওয়া এ স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৪ জুলাই (মঙ্গলবার) পেশাগত দায়িত্বপালন শেষে খুলনা সদর থানার জনগুরুত্বপূর্ণ শান্তিধাম মোড়ের জাতিসংঘ শিশুপার্কের পশ্চিম পাশে একধিক পত্রিকার অফিস সংলগ্ন রাস্তার ওপর আব্দুল জলিলের চায়ের দোকানে মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (এমইউজে) খুলনার কোষাধ্যক্ষ ও এসএ টিভির খুলনা ব্যুরো প্রধান রকিবুল ইসলাম মতি, এমইউজে খুলনার সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সদস্যসচিব ও স্টার নিউজের খুলনা ব্যুরো প্রধান রফিউল ইসলাম টুটুল, এমইউজে খুলনার সদস্য ও দৈনিক খুলনাঞ্চলের স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ হুমায়ুন কবীর রানা এবং খুলনা প্রেসক্লাবের অস্থায়ী সদস্য ও দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খুলনা ব্যুরো প্রধান আব্দুল আওয়াল শেখ বসেছিলেন।
এসময় এক মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত অতর্কিতে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
গুলিটি সাংবাদিক রকিবুল ইসলাম মতির বসে থাকা টুলে (চেয়ারে) আঘাত করে। এরপর গুলিটি সরাসরি শরীরে বিদ্ধ না হলেও সাংবাদিক আব্দুল আওয়াল শেখের বুকের ডানপাশ স্পর্শ করে পাশ কেটে চলে যায়। এতে তিনি বুকের ডানপাশে জখম হন। গুলিবর্ষণের পরপরই অজ্ঞাতনামা আসামীরা মোটর সাইকেলযোগে দ্রুতগতিতে শান্তিধাম মোড়ের দিকে পালিয়ে যায়। পরে আশপাশের লোকজন গুরুতর আহত সাংবাদিক আব্দুল আওয়াল শেখকে চিকিৎসার জন্য নগরীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল খুলনায় নিয়ে যান এবং সেখান থেকে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
এর আগে ২০০৪ সালের ২৭ জুন শান্তিধাম মোড়ে দৈনিক জন্মভূমি অফিসের সামনে দিনের বেলায় খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক জন্মভুমি সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালু, ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে দৈনিক সংবাদের খুলনা ব্যুরো প্রধান ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মানিক চন্দ্র সাহা, ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় খুলনা প্রেসক্লাব চত্বরে এমইউজে খুলনার সাবেক সভাপতি, দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান ও খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি শেখ বেলাল উদ্দিন এবং ২০০২ সালের ২ মার্চ সন্ধ্যায় নগরীর খালিশপুর থানাধীন মুজগুন্নি এলাকায় দৈনিক পুর্বাঞ্চলের ক্রাইম রিপোর্টার হারুন অর রশীদ খোকন দুর্বৃত্তদের গুলি ও বোমা হামলায় নিহত হন।
এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও পুলিশী দুর্বল তদন্ত ও চার্জশীটের ফলে আসামীরা পার পেয়ে যায়।
এর বাইরেও খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাংবাদিক নহর আলী ও শুকুর আলী এবং খুলনার সরকারি বিএল কলেজের সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রফিকসহ খুলনায় নিহত সকল সাংবাদিক হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার হলে সন্ত্রাসীরা আজ এমন ন্যাক্কারজনক হামলা করার সাহস পেত না।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০১-২০০৫ সালের চারদলীয় জোট সরকার আমলে আওয়ামী লীগ তৎকালীন সরকারকে বিব্রত করার লক্ষ্যে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থী-সন্ত্রাসীদের দিয়ে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের কিলিং মিশনে নেমেছিল আজও তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। যার অংশ হিসেবে খুলনায় সাংবাদিক মতি, টুটুল, রানা কবীর ও আওয়ালের ওপর হামলা করেছে। এমন একটি ঘটনার এক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও গুলিবর্ষণের মুল পরিকল্পনাকারী, অর্থযোগানদাতা এবং হামলাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি। এমনকি ঘটনার কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তাহলে কি অন্য মামলার মতো এ মামলাটিও ফাইল বন্দি হয়ে যাবে ? এ প্রশ্ন খুলনার সাংবাদিকদের।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে এই হামলা একটি নজিরবিহীন হুমকি। যারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা কেবল আইন ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী নয়, বরং বাক স্বাধীনতারও শত্রু। সাংবাদিকরা যদি জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তবে তা মুক্ত সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করে দেয়, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।