সম্পাদকীয়
যশোরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ বড় পর্দায় দেখানোর আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয় ধর্মের নাম ব্যবহার করে গুটিকয়েক ব্যক্তির কারণে। কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারে। তবে অবশ্যই তার যৌক্তিক কারণ থাকতে হয়। তেমন কিছু ছাড়াই তড়িঘড়ি খেলা দেখার আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
নির্মল আনন্দে বাধাদানের ঘটনা বহু মানুষকে বিমর্ষ করেছে। এটি আমাদের সমাজের কিছু মানুষের অসহিষ্ণুতার বাজে একটি উদাহরণ।
ঈদগাহ প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত বছরের দুটি ঈদে জামাত আদায়ের জন্য। কিন্তু সারা বছর এই মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে না। যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে বছরজুড়ে তরুণরা খেলাধুলা করে। পাবলিক প্লেস হিসেবে সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত হয় নানা ক্রীড়ানুষ্ঠানও; যেখানে নারীদের অংশগ্রহণও আমরা দেখে আসছি। আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/সংগঠন খেলা ছাড়াও নানা আয়োজনও করে এই মাঠে। এমনকী রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও হয়। দীর্ঘদিন ধরে এমনটি চলে আসছে।
ধর্মীয় কর্মসূচি বাদে অন্যান্য যে আয়োজন বছরজুড়ে ঈদগাহে হয়, তাতে ধর্মের কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে এযাবৎ কেউ অভিযোগ করেনি। অথচ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ প্রদর্শন কেন ঈদগাহের ‘পবিত্রতা’ রক্ষায় বাধা হলো, তা আমরা বুঝতে অক্ষম।
ইসলাম ধর্মে কি ফুটবল খেলা করা ও দেখাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে? যদি নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে এই খেলা চলে কীভাবে? কখনও তো কোনো ইসলামিক স্কলার এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। অধিকন্তু, সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপ ফুটবল দেখেছেন এই দেশের লাখো-কোটি মানুষ; যার অধিকাংশই ধর্মপ্রাণ মুসলিম। এইসব ধর্মপ্রাণ মানুষ কি ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছেন? তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম স্থানগুলোর হেফাজতকারী সৌদি আরব এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানও ছিল। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া মিসর, আলজেরিয়া, ইরাক, মরক্কোর মতো দেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মানুসারী। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলে মুসলিম খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম নয়।
‘সচেতন দ্বীনদার নাগরিক’ ব্যানারে গুটিকয়েক ব্যক্তির প্রতিবাদ কখনই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের বক্তব্য হতে পারে না। স্বাভাবিক ও নির্মল আনন্দকে যদি এভাবে ধর্মের নামে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সমাজ দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে।
ফুটবল খেলায় অংশ নেওয়া বা তা দেখা হারাম কাজ নাকি? ঈদগাহে ফুটবল খেলা প্রদর্শনকে ধর্মবিরোধী বলে চিহ্নিত করা অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। আর যদি কেউ প্রকৃত ধর্মীয় কারণে আপত্তি জানান, তবে বছরের অন্যান্য সময় যখন এখানে খেলাধুলা হয়, তখন তাদের আপত্তি করতে দেখা যায় না কেন? মতলববাজিরও সীমা থাকা উচিত।
যত্রতত্র ধর্মের ব্যবহার মহান ধর্ম ইসলামকে উচ্চে তুলে ধরে না। যদি কেউ এই ধর্মের ঔদার্য ধারণ করতে না পারেন, তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। ধর্মের মর্যাদা ও মানুষের উচ্ছ্বাসের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরি করে মহলবিশেষ কী অর্জন করতে চায়, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে কারও কোনো মতলবি তৎপরতা দৃঢ় হাতে বন্ধ করে দেওয়া দরকার ছিল প্রশাসনের। পরবর্তীতে এধরনের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে যশোরের পুলিশ প্রশাসন শক্ত অবস্থান নেবে বলে আমরা প্রত্যাশা রাখছি।